মব সহিংসতার বিরুদ্ধে ইসলামের কঠোর অবস্থান
- অহেতুক মব সৃষ্টির ভয়াবহ পরিণতি

প্রতীকী ছবি
একটি সামাজিক কাঠামো গঠিত হয় বহু মানুষের সমন্বয়ে। এই কাঠামো তখনই দৃঢ় থাকে, যখন বিচার-বিবেচনা, ন্যায়বোধ ও সংযম মানুষের আচরণকে পরিচালিত করে। কিন্তু যখন এই বোধ হারিয়ে যায় এবং জনতার আবেগ আইনের স্থলাভিষিক্ত হয়, তখনই জন্ম নেয় মব। মব একটি বেপরোয়া, নিয়ন্ত্রণহীন শক্তি, যা মুহূর্তেই ন্যায়কে অন্যায়ে রূপান্তরিত করে দেয়। ইসলাম এ ধরনের অন্যায় ও সমষ্টিগত সহিংসতার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট ও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে।
হিশাম ইবনে হাকিম ইবনে হিযাম (রহ.) থেকে বর্ণিত হাদিসটি আমাদের সামনে একটি গভীর নৈতিক শিক্ষা তুলে ধরে। তিনি যখন সিরিয়ায় কিছু মানুষকে উত্তপ্ত সূর্যের নিচে দাঁড় করিয়ে শাস্তি দিতে দেখলেন, তখন তিনি প্রতিবাদ করে বলেন, ‘হুঁশিয়ার! আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা সেসব লোককে শাস্তি দেবেন, যারা দুনিয়ায় মানুষকে (অন্যায়ভাবে) শাস্তি দেয়।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৬১৩)
এই হাদিসের অন্তর্নিহিত বার্তা অত্যন্ত সুস্পষ্ট। মানুষের ওপর অন্যায় শাস্তি আরোপ করা, বিশেষত জনতার উন্মত্ততার মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার আল্লাহর কাছে ভয়াবহ অপরাধ বলে গণ্য।
পবিত্র কোরআনেও এ বিষয়ে কঠোর সতর্কতা উচ্চারণ করে বলা হয়েছে, ‘আর তোমরা কারও প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে যেন ন্যায়ের সীমা লঙ্ঘন না করো। ন্যায়বিচার করো, এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত : ৮)
মব মানসিকতার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো— এটি
ব্যক্তিকে তার বিবেক থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। জনতার আবেগে ভেসে গিয়ে মানুষ এমন কাজ
করে বসে, যা
সে একা কখনোই করত না। ইসলাম এই অন্ধ অনুসরণের প্রবণতাকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছে। আল্লাহ বলেন,
‘আর তুমি এমন কিছুর অনুসরণ করো না, যার সম্পর্কে তোমার কোনো জ্ঞান নেই।’ (সুরা ইসরা, আয়াত : ৩৬)
অহেতুক মব সৃষ্টি সাধারণত গুজব, অপপ্রচার কিংবা ব্যক্তিগত বিদ্বেষের ফল। অথচ ইসলাম সংবাদ যাচাইয়ের ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে দেখো…’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ৬)
এই আয়াতটি আজকের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে গুজব মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে, আর সে গুজবই অনেক সময় নিরপরাধ মানুষের ওপর মব আক্রমণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ একটি যাচাইহীন খবরের ওপর ভিত্তি করে কারও জীবন নষ্ট করা ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর জুলুম।
ইসলামি শরিয়তে বিচার ও শাস্তির অধিকার কোনো ব্যক্তির হাতে নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ার কথা। হিশাম ইবনে হাকিম ইবনে হিযাম (রহ.) বর্ণিত এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী (রহ.) বলেছেন, ‘এখানে ‘মানুষকে শাস্তি দেওয়া’ বলতে অন্যায়ভাবে, শরিয়তসম্মত প্রক্রিয়া ছাড়া শাস্তি দেওয়া বোঝানো হয়েছে। এটি জুলুমের অন্তর্ভুক্ত এবং কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।’ (শরহ সহিহ মুসলিম) অর্থাৎ, ইসলামি বিচার ব্যবস্থায় মব জাস্টিস বা জনতার বিচারের কোনো স্থান ইসলামে নেই; বরং এটি একটি মারাত্মক অপরাধ, যা সমাজে অরাজকতা সৃষ্টি করে এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তিকে ধ্বংস করে।
ইবনে তাইমিয়্যা (রহ.) বলেন, ‘ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব; ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাজ নয়। কারণ, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ ও আবেগের বশবর্তী হয়ে মানুষ প্রায়ই সীমা লঙ্ঘন করে।’ (আস-সিয়াসাহ আশ-শারইয়্যাহ)
মব সৃষ্টির ভয়াবহ পরিণতি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমাজের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও আস্থাকে ধ্বংস করে দেয়। যখন মানুষ দেখে যে, কোনো অপরাধ প্রমাণ ছাড়াই জনতার হাতে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, তখন আইনের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা ও ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন, ‘একজন মুসলিমের জন্য আরেক মুসলিমের রক্ত, সম্পদ এবং তার সম্মান হারাম।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৪)
মব আক্রমণে এই তিনটি বিষয় লঙ্ঘিত হয়— মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মান। তাই এটি শুধু একটি সামাজিক অপরাধ নয়; বরং এটি ইসলামের মৌলিক নীতির সরাসরি পরিপন্থি।
আজকের সমাজে আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আবেগের পরিবর্তে বিবেককে জাগ্রত করা। কোনো অভিযোগ শুনলেই উত্তেজিত হয়ে ওঠা নয়; বরং যাচাই করা, ধৈর্য ধারণ করা এবং আইনগত প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রাখাই ইসলামের শিক্ষা।
আমাদের মনে রাখতে হবে যে, অহেতুক মব সৃষ্টি শুধু একটি তাৎক্ষণিক অন্যায় নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ধ্বংসের সূচনা। এটি ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র তিনটিকেই বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এর পরিণতি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জায়গায়ই ভয়াবহ।
এই বাস্তবতায় আমাদের দায়িত্ব হলো ন্যায়, সংযম ও প্রজ্ঞার পথ অবলম্বন করা; গুজব থেকে দূরে থাকা এবং যেকোনো ধরনের মব মানসিকতার বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলা। কারণ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয় আইনের মাধ্যমে, জনতার উন্মত্ততার মাধ্যমে নয়।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
saifpas352@gmail.com



