বৈশ্বিক বিপর্যয়ে নিরাপদ থাকার কুরআন-হাদীস সমর্থিত আমল
- বিপর্যয়ের সময় মুমিনের করণীয়
- বিপর্যয়ের অন্ধকারে ঈমানের প্রদীপ

ছবিঃ আগামীর সময়
আজকের বিশ্বে মানুষ বিভিন্ন ধরনের বিপর্যয় ও ঝুঁকির মুখোমুখি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক অশান্তি, রোগব্যাধি বা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, যুদ্ধ-বিগ্রহ; এই সমস্ত পরিস্থিতিতে নিরাপদ থাকা এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য জরুরি। ইসলাম এমন পরিস্থিতিতে নিরাপদ থাকার জন্য কিছু আমল নির্দেশ করেছে। এই প্রবন্ধে আমরা কুরআন ও হাদীসের আলোকে বৈশ্বিক বিপর্যয়ে নিরাপদ থাকার গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলো আলোচনা করব।
১. আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা (তাওয়াক্কুল)
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন:
وَمَن يَتَوَكَّلْ
عَلَى اللَّهِ
فَكَفَىٰهُ ۚ
إِنَّ اللَّهَ
بَالِغُ أَمْرِهِ
“যে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট, আল্লাহ তাঁর নিয়ন্ত্রণসম্পন্ন পরিকল্পনা সম্পূর্ণ করেন।” (সূরা আত-তালাক. আয়াত : ৩)
বিপর্যয়ের সময় মানুষকে অনেক ধরনের অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়। এসব মোকাবেলা করতে শুধু পদক্ষেপ গ্রহণ যথেষ্ট নয়, বরং আল্লাহর উপর বিশ্বাস রেখে ধৈর্য্য ধারণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাওয়াক্কুল মানে হলো পরিশ্রম করা, পরিকল্পনা করা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা। এটি বিপদজনক পরিস্থিতিতেও মানসিক শান্তি এবং আত্মবিশ্বাস বজায় রাখে।
২. নিয়মিত দোয়া করা
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন:
وَقَالَ رَبُّكُمُ
ادْعُونِي أَسْتَجِبْ
لَكُمْ
“তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকের উত্তর দেব।” (সূরা গাফির, আয়াত: ৬০)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
مَنْ
لَمْ يَسْأَلِ
اللَّهَ
يَغْضَبْ
عَلَيْهِ
“যে আল্লাহর কাছে চায় না, আল্লাহ তার ওপর অসন্তুষ্ট হন।” (তিরমিজি, হাদীস : ৩৩৭৩)
বিপদ বা ঝুঁকির সময় দোয়া মানসিক শান্তি দেয় এবং আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে সহায়ক হয়। নিয়মিত দোয়া মানুষের বিশ্বাস ও আত্মিক শক্তি বৃদ্ধি করে।
৩. বিপদের সময় বেশি বেশি নফল সালাত আদায় করা
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন:
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اسۡتَعِیۡنُوۡا بِالصَّبۡرِ وَ الصَّلٰوۃِ ؕ اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الصّٰبِرِیۡنَ
ভাবার্থের অনুবাদ: “হে ঈমানদার মুসলিমগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্যের জন্য ধৈর্যধারণ ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো! নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের জন্য সাহায্যকারী”। (সূরা আল-বাকারা, আয়াত নং ১৫৩)
হাদীসে এসেছে-
كَانَ
النَّبِيُّ
ﷺ إِذَا
حَزَبَهُ
أَمْرٌ صَلَّى
“নবী ﷺ যখন কোনো কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হতেন, তখন তিনি সালাতে দাঁড়িয়ে যেতেন।” (আবু দাউদ, হাদীস ১৩১৯)
বিপর্যয়ের সময় মানুষের ধৈর্য্য, আত্মসংযম এবং মানসিক স্থিতি বজায় রাখতে সালাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ শান্তি ও সমাজে ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখতেও সহায়ক।
৪. হালাল আয় ও খাদ্যাভ্যাসের সর্বময় চেষ্ঠা করা
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন:
يَا أَيُّهَا
الَّذِينَ آمَنُوا
كُلُوا مِن
طَيِّبَاتِ مَا
رَزَقْنَاكُمْ وَاشْكُرُوا
لِلَّهِ
“হে বিশ্বাসীরা! তোমরা যা খাও, তা হালাল ও বিশুদ্ধ হওয়া উচিত এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হও।” (সূরা বাকারাহ, আয়াত : ১৬৯)
সহীহ মুসলিমে প্রসিদ্ধ এক হাদীসে এসেছে-
ثُمَّ
ذَكَرَ الرَّجُلَ...
يَمُدُّ
يَدَيْهِ
إِلَى السَّمَاءِ...
وَمَطْعَمُهُ
حَرَامٌ...
فَأَنَّى
يُسْتَجَابُ
لَهُ
“এক ব্যক্তি আকাশের দিকে হাত তুলে দোয়া করে... কিন্তু তার খাদ্য হারাম... তাহলে তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে?” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১০১৫)
বিপর্যয়ের সময় আমাদের খাদ্যাভ্যাসও নিরাপত্তার সাথে সম্পর্কিত। হালাল এবং বিশুদ্ধ খাদ্য গ্রহণ করলে শরীর ও মন সুস্থ থাকে, যা বিপদ মোকাবেলায় সাহায্য করে।
৫. সৎ নিয়তে সমাজসেবা করা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
وَاللَّهُ
فِي عَوْنِ
الْعَبْدِ
مَا كَانَ
الْعَبْدُ
فِي عَوْنِ
أَخِيهِ
“বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকলে আল্লাহও তার সাহায্যে থাকেন।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৬৯৯)
বিপর্যয়ের সময় পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক সহায়তা ব্যক্তিগত এবং সাম্প্রদায়িক নিরাপত্তা বৃদ্ধি করে। সাহায্য এবং সদ্ব্যবহার আল্লাহর কাছে নৈকট্য ও সুরক্ষা প্রাপ্তির একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
কাজেই বৈশ্বিক বিপর্যয়ে নিরাপদ থাকার জন্য কুরআন ও হাদীস যে আমলগুলো নির্দেশ করে; এসব অনুসরণ করলে ব্যক্তি শারীরিক, মানসিক ও আত্মিকভাবে নিরাপদ থাকে। বিপদ মোকাবেলায় শুধুমাত্র প্রচেষ্টা নয়, আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ও ইবাদত আমাদের জীবনের সুরক্ষার বড় চাবিকাঠি।
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে নিরাপদ থেকে তাঁর দাসত্ব করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
saifpas352@gmail.com



