কিশোর গ্যাং নয়, গড়ে তুলতে হবে চরিত্রবান প্রজন্ম

প্রতীকী ছবি
কিশোর বয়স জীবনের এমন এক সন্ধিক্ষণ, যখন মানুষ শৈশব পেরিয়ে নিজের পরিচয়, স্বাধীনতা ও সামাজিক অবস্থান খুঁজতে শুরু করে। এই বয়সে পাওয়া শিক্ষা, সঙ্গ ও পরিবেশ তার ভবিষ্যৎ চরিত্র নির্মাণে গভীর প্রভাব ফেলে। অথচ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে মারামারি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ও আধিপত্য বিস্তারের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ার খবর উদ্বেগ তৈরি করছে। কখনো সামান্য কথাকাটাকাটি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্য কিংবা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। প্রশ্ন হলো, যে বয়সে চরিত্র গঠনের কথা, সে বয়সে অপরাধের সংস্কৃতি কেন জায়গা করে নিচ্ছে?
ইসলাম কিশোরকে অবহেলার পাত্র হিসেবে দেখেনি। বরং তরুণ বয়সের শক্তি ও উদ্যমকে সঠিক পথে পরিচালনার শিক্ষা দিয়েছে। কোরআনে মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, তারা ‘ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে’। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৪) এই শিক্ষা কিশোর অপরাধের অন্যতম মূল জায়গায় আঘাত করে। কারণ অনেক সংঘাতের শুরু হয় ক্রোধ থেকে, আর ক্রোধের পরিণতি হয় প্রতিশোধে। ইসলাম সেই প্রতিক্রিয়ার জায়গায় আত্মসংযমকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং শক্তিশালী সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬১১৪) ফলে ইসলামের কাছে শক্তি মানে অন্যকে ভয় দেখানো নয়; নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। কিশোর গ্যাং সংস্কৃতিতে যেখানে দলবল, পেশিশক্তি ও প্রতিশোধকে প্রভাবের মাপকাঠি বানানো হয়, সেখানে এই নববী শিক্ষা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চরিত্রের ধারণা দেয়।
কিশোর অপরাধের পেছনে বন্ধুত্ব ও সামাজিক পরিবেশের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। কোরআনে সতর্ক করা হয়েছে, কিয়ামতের দিন কেউ কেউ বলবে, ‘হায়, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম!’। (সুরা ফুরকান, আয়াত : ২৮) এর পরের আয়াতে বলা হয়েছে, সেই ব্যক্তি তাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। সৎ ও অসৎ সঙ্গের প্রভাব নিয়ে ইসলামের এই সতর্কতা কিশোরদের ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ কৈশোরে বন্ধুবৃত্ত অনেক সময় পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরের একটি শক্তিশালী পরিচয় তৈরি করে।
এখানে অভিভাবকের দায়িত্বও অনস্বীকার্য। সন্তানকে অর্থ, পোশাক ও শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি তার বন্ধু, অবসর, অনলাইন কর্মকাণ্ড, মানসিক পরিবর্তন ও মূল্যবোধের দিকেও নজর দিতে হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৭১৩৮) অর্থাৎ সন্তান লালন-পালন শুধু ভরণপোষণের বিষয় নয়; এটি নৈতিক দায়িত্বও।
ইমাম আল-গাজালি (রহ.) ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন-এ মানুষের চরিত্র সংশোধনের আলোচনায় আত্মসংযম ও প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তার নৈতিক দর্শনের একটি মৌলিক শিক্ষা হলো, মানুষের প্রবৃত্তিকে নির্মূল করা নয়, বরং জ্ঞান ও শরিয়তের নির্দেশনার অধীনে তাকে পরিচালিত করা। কিশোরদের ক্ষেত্রেও তাই শুধু ‘এটা করো না’ বললে যথেষ্ট নয়; তাদের শক্তি, সাহস ও নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষাকে কল্যাণকর কাজে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
এ জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও সমাজকে কিশোরদের জন্য ইতিবাচক পরিসর তৈরি করতে হবে। খেলাধুলা, বই পড়া, দক্ষতা অর্জন, স্বেচ্ছাসেবা, সামাজিক উদ্যোগ ও ধর্মীয়-নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। পবিত্র কোরআন বলে, ‘সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে তোমরা পরস্পর সহযোগিতা করো।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ২) কিশোরদের দলবদ্ধ হওয়ার প্রবণতাকে অপরাধী গোষ্ঠীর বদলে কল্যাণমুখী দলের দিকে পরিচালিত করাও এই শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ হতে পারে।
তবে অপরাধ সংঘটিত হলে আইনের প্রয়োগের প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে অপরাধের কারণ চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। কিশোরকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার আগেই যদি তার ভেতরের ক্ষোভ, একাকিত্ব, ভুল বন্ধুত্ব, উদ্দেশ্যহীন অবসর কিংবা বিকৃত সামাজিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষাকে বোঝা যায়, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে অপরাধের পথ থেকে তাকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
একটি কিশোরের হাতে যে শক্তি আজ ছুরি হয়ে উঠছে, সেটিই আগামীকাল বই, স্টেথোস্কোপ, কম্পিউটার, খেলাধুলা কিংবা সমাজসেবার উপকরণ হতে পারে। পার্থক্যটি তৈরি করে তার চরিত্র ও পরিবেশ। তাই কিশোরদের শুধু ভয় দেখিয়ে নয়, তাদের ভেতরের শক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করেই তাদের গড়ে তুলতে হবে। কারণ ইসলাম এমন তরুণ চায় না, যে অন্যকে পরাজিত করে নিজের শক্তি প্রমাণ করবে; ইসলাম এমন প্রজন্ম চায়, যে নিজের নফসকে জয় করে মানুষের জন্য কল্যাণের কারণ হবে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



