হজের সফরে ভুলভ্রান্তি
যেসব ভুলে অপূর্ণ থেকে যায় আপনার বহু সাধনার হজ (২য় পর্ব)

সংগৃহীত ছবি
[দ্বিতীয় পর্ব]
হজ এমন এক অনন্য ইবাদত, যার নিয়ত করার মুহূর্তেই বান্দা আল্লাহতাআলার কাছে সহজতা ও কবুলিয়তের জন্য দোয়া করে। এ থেকেই বোঝা যায়, অন্যান্য ইবাদতের তুলনায় হজের আমল কতটা পরিশ্রমসাধ্য ও জটিল। তাই হজ আদায়ের জন্য শুধু মাসয়ালা জানা যথেষ্ট নয়; বরং এর সঠিক পদ্ধতি, সময়োপযোগী কৌশল এবং অভিজ্ঞদের পরামর্শও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বাস্তবে দেখা যায়, হজের অনেক ভুল হয় জ্ঞানের অভাবে নয়, বরং অবহেলা ও অসচেতনতার কারণে। অথচ সামান্য সতর্কতা ও প্রস্তুতি নিলে এসব ভুল সহজেই এড়িয়ে চলা সম্ভব। এজন্য নিচে হজ পালনের সময় সাধারণত যে ভুলগুলো হয়ে থাকে, সেগুলো আমরা একে একে ধারাবাহিকভাবে আমাগীর সময় পাতায় পাঠকদের সামনে তুলে ধরব ইনশাআল্লাহ। যাতে হাজিরা সচেতন থেকে সঠিকভাবে হজ আদায় করতে পারেন।
আজ আমরা তুলে ধরব-
বাইতুল্লাহর যত্রতত্র চুম্বন, স্পর্শ ও আলিঙ্গন করা
অনেককে বাইতুল্লাহর কোনো স্থান ফাঁকা পেলেই গিলাফ ধরতে, দেয়ালে চুমু দিতে, সীনা লাগাতে ও স্পর্শ করতে দেখা যায়। অথচ বাইতুল্লাহর সব স্থান স্পর্শ করা বা চুমু খাওয়া সওয়াবের কাজ নয়। রাসূৈল (সা.), সাহাবা ও তাবেয়ীন থেকে কেবল সীমিত কিছু স্থান স্পর্শ করা আর কিছু ক্ষেত্রে চুমু খাওয়ার কথা বর্ণিত আছে। যা নিম্নরূপ :
১. হাজরে আসওয়াদ। হাজরে আসওয়াদকে স্পর্শ করা, চুমু খাওয়া হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
২. রুকনে ইয়ামানী। বাইতুল্লাহর দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ হল রুকনে ইয়ামানী। এই কোণে ডান হাত বা উভয় হাত দ্বারা স্পর্শ করা সুন্নত। কেউ কেউ চুমু খাওয়ার কথাও বলেছে।
৩. মুলতাজাম। এটি হাজরে আসওয়াদ থেকে বাইতুল্লাহর দরজা পর্যন্ত- স্থান। এখানে সীনা, গাল ও উভয় হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে দুআ করার কথা হাদীসে বর্ণিত আছে।
৪. কাবা ঘরের দরজার চৌকাঠ ধরা এবং দুআ করা।
(জামে তিরমিযী ১/১৭৪; সহীহ মুসলিম ১/৪১২; মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩৯৬৪; মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ১৩৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২২৫; আলমুগনী ইবনে কুদামা ৫/২২৭)
তাওয়াফে নির্দিষ্ট দোয়াকে জরুরি মনে করা
অনেকেই তাওয়াফের প্রতি চক্করের জন্য ভিন্ন ভিন্ন নির্দিষ্ট দোয়া পড়াকে জরুরি মনে করেন। ফলে নির্দিষ্ট ঐ দোয়া শেষ হয়ে গেলে অন্য দোয়া পড়েন না। নির্দিষ্ট দোয়অটি নিজের মুখস্থ না থাকলে অন্যের সাহায্য নেন। এ ধারণাটি ভুল। তাওয়াফ অবস্থায় নির্দিষ্ট দোয়া্ পড়া জরুরি নয়। রুকনে ইয়ামানী ও হাজরে আসওয়াদের মাঝে ‘রাব্বানা আতিনা ফিদ্ দুনিয়া হাসানাহ ... ’ এইদোয়া পড়া উত্তম। এটি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
এ ছাড়া পুরো তাওয়াফে দোয়াসে মাসুরাহ তথা কুরআন-হাদিস বা সাহাবায়ে কেরাম থেকে বর্ণিত যে কোনো দোয়াই পড়া যেতে পারে। এমনিভাবে অন্য যে কোনো ভালো অর্থবোধক দোয়াও পড়া যেতে পারে। দোয়া আরবীতে করাও জরুরি নয়। নিজের ভাষায় করা যেতে পারে।
জামাতবদ্ধ হয়ে তাওয়াফ করা
অনেকে জামাতবদ্ধ হয়ে তাওয়াফ করে এবং জামাতের মধ্যে একজন মুখস্থ বা দেখে দেখে উঁচু আওয়াজে দোয়া পড়ে আর তার সঙ্গে পুরো জামাত সমস্বরে দোয়া পড়তে থাকে। এ নিয়মে একাধিক আপত্তিকর বিষয় রয়েছে-
(ক) সমস্বরে দলবদ্ধভাবে দোয়া পড়ার কারণে অন্যদের একাগ্রতা বিঘ্নিত হয়।
(খ) এভাবে দোয়া পড়া-পড়ানোর রেওয়াজ সালাফ থেকে প্রমাণিত নেই। এজন্যও তা ত্যাগ করা দরকার।
(গ) আরো একটি বড় ক্ষতি হল, দলবদ্ধভাবে চলার কারণে মাতাফে ভিড় সৃষ্টি হয়। অন্যদের উপর অস্বাভাবিক চাপ পড়ে। এতে অন্যদের ভীষণ কষ্ট হয়। অপ্রয়োজনীয় কাজের জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা অন্যায়।
যদি সকলেই নিজে নিজে চলতো এবং দেখে দেখে দোয়া না পড়তো; বরং যা মুখস্থ আছে তাই পড়তো তাহলে মাতাফে হঠাৎ যে চাপ সৃষ্টি হয় তা অনেক কমে যেত এবং সকলেই একাগ্রতার সঙ্গে আল্লাহ তাআলার ধ্যানে নিমগ্ন থেকে দোয়া ও তাওয়াফ করতে পারত।
(ইলাউস সুনান ১০/৮২; বাদায়েউস সানায়ে ২/৩৪০; মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ১৩৫; রদ্দুল মুহতার ২/৪৯৭-৪৯৮)
পুরো তাওয়াফে রমল করা
অনেককে দেখা যায়, তাওয়াফের ৭ চক্করেই রমল করে থাকে। আবার কেউ কেউ নফল তাওয়াফেও রমল করে। তিনি মনে করেনে, রমল সকল তাওয়াফে এবং তাওয়াফের সব চক্করেই করতে হয়। অথচ এটি ভুল। রমল শুধু ওই তাওয়াফেই করতে হয়; যে তাওয়াফের পর সাঈ আছে। আর এই তাওয়াফেরও সব চক্করে নয় শুধু প্রথম তিন চক্করে।
অন্যকে কষ্ট দিয়ে রমল করা
রমল করা সুন্নত। মাতাফে কোনো কোনো সময় অস্বাভাবিক ভিড় হয়। বিশেষ করে হজ্বের আগে দু’এক দিন এবং যিলহজ্বের ১০-১১ তারিখে। তখন মাতাফে চলাই মুশকিল হয়। সামান্য নড়া-চড়ার প্রভাব পড়ে অনেক দূর পর্যন্ত। কিন্তু আশ্চর্য হল, ওই কঠিন ভিড়েও কাউকে কাউকে রমল করতে দেখা যায়। এতে নিজেরও প্রচুর কষ্ট হয়। বিশাল জনসমুদ্রকেও কষ্ট দেওয়া হয়। তাদের অবস্থা দেখে মনে হয়, রমলটা তাওয়াফের ফরয অংশ। এজন্যই বুযুর্গগণ বলেন, ‘যথাযথ হজ্ব করতে হলে সামান্য ইলম যথেষ্ট নয়; বরং প্রচুর ইলম এবং তার সঙ্গে অনেক বেশি আকলের প্রয়োজন।’’ রমল ছাড়াও তাওয়াফ আদায় হয়ে যায়। তাই প্রচণ্ড ভিড়ে অন্যকে কষ্ট দিয়ে রমল করা যাবে না; বরং তখন স্বাভাবিকভাবে চলবে। চলতে চলতে কখনো সামান্য ফাঁকা পেলে এবং অন্যের কষ্ট না হলে স্বাভাবিক গতিতে রমলের চেষ্টা করবে। (সহীহ মুসলিম ১/৪১০; মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ১৩৩-১৩৪; আলমুগনী ইবনে কুদামা ৫/২১৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২২৬)
মহিলাদের রমল
রমল শুধু পুরুষের জন্য। এ বিধানটি মহিলাদের জন্য নয়। কিন্তু কখনো কখনো মহিলাদেরকেও তা করতে দেখা যায়। এটি ভুল। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩১১০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৩৫; আলমুগনী ইবনে কুদামা ৫/২৩৬)
উৎস : আল-কাউসার, নভেম্বর ২০০৯ সংখ্যায় প্রকাশিত মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রচিত হজবিষয়ক ভুলভ্রান্তি প্রবন্ধ।
(…. চলবে ইনশাআল্লাহ)



