কোরবানির ইতিহাসে পিতা-পুত্রের অনন্য আত্মসমর্পণ

প্রতীকী ছবি
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রাপ্ত প্রিয় সন্তান ইসমাইল (আ.) যখন এমন বয়সে উপনীত হলেন যে, তিনি পিতার সহচর ও সহযোগী হতে পারেন, ঠিক তখনই সামনে এলো ইতিহাসের অন্যতম কঠিন পরীক্ষা। যে সন্তান ছিল বৃদ্ধ পিতার চোখের শীতলতা, হৃদয়ের প্রশান্তি ও জীবনের অবলম্বন, আল্লাহ তাআলা তাকেই কোরবানি করার নির্দেশ দিলেন।
ইবরাহিম (আ.) স্বপ্নে দেখলেন, তিনি তাঁর প্রিয় সন্তানকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে জবাই করছেন। আর নবীদের স্বপ্ন যেহেতু ওহির মর্যাদা রাখে, তাই তিনি বুঝে গেলেন যে, এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই এসেছে।তখন তিনি স্নেহভরে পুত্রকে ডেকে বললেন, ‘হে আমার প্রিয় পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখছি যে, আমি তোমাকে জবাই করছি। এখন বলো, তোমার মত কী?’
জবাবে ইসমাইল (আ.) বললেন, ‘হে আমার পিতা! আপনাকে যে আদেশ করা হয়েছে, তা-ই করুন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন’। (সুরা আস-সাফফাত, আয়াত : ১০২)
পবিত্র কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্তান যখন এমন বয়সে পৌঁছোল যে, তিনি পিতার কাজের সঙ্গী ও সহচর হতে পারেন, তখনই এ নির্দেশ এলো।
আল্লাহ তাআলা চাইলে সরাসরি ফেরেশতার মাধ্যমে এ নির্দেশ দিতে পারতেন। কিন্তু স্বপ্নের মাধ্যমে আদেশ দেওয়ার মধ্যেও ছিল গভীর প্রজ্ঞা। সাধারণ মানুষের স্বপ্নের মতো এতে সন্দেহ বা দ্বিধার কোনো অবকাশ না থাকলেও, ইবরাহিম (আ.)-এর জন্য এটি ছিল আত্মসমর্পণ ও আনুগত্যের এক কঠিন পরীক্ষা। আর তিনি বিন্দুমাত্র অপব্যাখ্যা বা শৈথিল্যের আশ্রয় না নিয়ে নিঃশর্তভাবে রবের নির্দেশের সামনে আত্মসমর্পণ করেছিলেন।
এই ঘটনার আরেকটি বিস্ময়কর দিক হলো এই যে, ইসমাইল (আ.)-এর গভীর জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও আদব।
ইবরাহিম (আ.) তাঁকে সরাসরি বলেননি যে, ‘এটি আল্লাহর আদেশ’; বরং শুধু স্বপ্নের কথা উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু ইসমাইল (আ.) সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে গেলেন যে, নবীদের স্বপ্নও ওহি। তাই তিনি উত্তরে স্বপ্নের প্রসঙ্গ উল্লেখ না করে সরাসরি বললেন, ‘হে আমার পিতা! আপনাকে যে আদেশ করা হয়েছে, তা পালন করুন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।’
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) লিখেছেন, “এই বাক্যে ইসমাইল (আ.)-এর চরম আদব ও বিনয় প্রকাশ পেয়েছে। তিনি ‘ইনশাআল্লাহ’ বলে বিষয়টিকে আল্লাহর ইচ্ছার ওপর ন্যস্ত করেছেন। ফলে আত্মপ্রশংসার সম্ভাবনা দূর হয়েছে। আবার তিনি বলেননি, ‘আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন’; বরং বলেছেন, ‘ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন’। এর মাধ্যমে তিনি নিজের জন্য কোনো বিশেষত্ব দাবি না করে বিনয় ও নম্রতার সর্বোচ্চ পরিচয় দিয়েছেন।” (মাআরিফুল কুরআন, ৭/৪৫৯)
কী অপূর্ব সেই আত্মত্যাগের দৃশ্য! একদিকে পিতা নিজের হাতে সন্তানের গলায় ছুরি চালাচ্ছেন, অন্যদিকে সন্তানও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নির্ভয়ে নিজের গলা পেতে দিচ্ছেন। খলীলুল্লাহ ইবরাহিম (আ.) এবং যবীহুল্লাহ ইসমাইল (আ.); উভয়েই নিজেদের দায়িত্ব পূর্ণাঙ্গভাবে আদায় করলেন।
তখন আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করলেন, ‘নিশ্চয়ই তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ। আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি।’ (সুরা আস-সাফফাত, আয়াত : ১০৫) অর্থাৎ আল্লাহর নির্দেশ পালনে তাঁরা বিন্দুমাত্র ত্রুটি করেননি; বরং পরীক্ষায় পূর্ণ সফলতা অর্জন করেছেন।
এই কোরবানি আল্লাহ তাআলার নিকট এতটাই প্রিয় হয়ে গেল যে, তিনি একে কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য স্মরণীয় ইবাদত ও তাঁর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম বানিয়ে দিলেন। আজও বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান ঈদুল আজহার মাধ্যমে সেই মহান আত্মত্যাগের স্মৃতি পুনর্জীবিত করে চলেছে।
মূলত কোরবানির শিক্ষা হলো; আল্লাহর আদেশের সামনে মানুষের সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটিও তুচ্ছ হয়ে যাবে। একজন সত্যিকার মুমিন কখনো রবের সন্তুষ্টির চেয়ে দুনিয়ার কোনো সম্পর্ক, সম্পদ বা আবেগকে অগ্রাধিকার দিতে পারে না।
আজ মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সেই ইবরাহিমী আত্মসমর্পণ, সেই ইসমাইলী ধৈর্য এবং সেই কোরবানির স্পৃহা।
এই চেতনা শুধু পশু কোরবানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রবৃত্তি, স্বার্থ, অহংকার ও দুনিয়াবি মোহ ত্যাগ করার মধ্যেই কোরবানির প্রকৃত রূহ নিহিত।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের অন্তরে ইখলাস, ত্যাগের মানসিকতা, তাওয়াক্কুল ও কোরবানির সেই ইবরাহিমী চেতনা দান করুন। আমীন ইয়া রব্বাল আলামীন।
লেখক : সিনিয়র শিক্ষক, মদিনাতুল উলুম মাদ্রাসা, বসুন্ধরা, ঢাকা।




