হাদিসের কথা
যে অভ্যাস ব্যক্তিকে জান্নাতে পৌঁছে দেয়
- সত্য ও মিথ্যার দুই পথ, দুই পরিণতি
- সততার আলো আর মিথ্যার অন্ধকার

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবনে কিছু শব্দ আছে, যেগুলো শুধু উচ্চারণ নয়- সেগুলো চরিত্র গঠন করে, ভাগ্য নির্ধারণ করে, এমনকি আখিরাতের পরিণতিও ঠিক করে দেয়। ‘সত্য’ তেমনই এক শব্দ। এটি কেবল একটি নৈতিক গুণ নয়; বরং এটি একজন মানুষের অন্তরের পরিচয়, ঈমানের প্রতিচ্ছবি এবং আল্লাহর নিকট তার মর্যাদার মাপকাঠি। যখন চারপাশে প্রতারণা, অর্ধসত্য আর স্বার্থের হিসাব-নিকাশ মানুষের ভাষাকে কলুষিত করে ফেলে, তখন সত্যবাদিতা হয়ে ওঠে এক নীরব ইবাদত- যা মানুষকে আল্লাহর কাছে পৌঁছে দেয়। এই প্রেক্ষাপটেই রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের জন্য এক গভীর জীবনদর্শন রেখে গেছেন—
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " إِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَصْدُقُ حَتَّى يُكْتَبَ صِدِّيقًا وَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَكْذِبُ حَتَّى يُكْتَبَ كَذَّابًا " .
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সততা সৎকর্মের দিকে পথপ্রদর্শন করে আর সৎকর্ম জান্নাতের পথপ্রদর্শন করে। নিশ্চয়ই কোনো মানুষ সত্য কথা বলতে থাকে তখন সত্যবাদী হিসেবে (তার নাম) লিপিবদ্ধ হয়। আর অসত্য পাপের পথপ্রদর্শন করে এবং পাপ জাহান্নামের দিকে পথপ্রদর্শন করে। আর মানুষ মিথ্যা কথা বলতে বলতে অবশেষে আল্লাহর কাছে মহামিথ্যাচারী প্রতিপন্ন হয়ে যায়। (সহিহ বুখারী. হাদীস: ৬০৯৪; সহিহ মুসলিম, হাদীস : ২৬০৭)
এই হাদীসটি মানুষের চরিত্র গঠনের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া তুলে ধরে। এখানে সত্য ও মিথ্যাকে শুধু আলাদা দুটি কাজ হিসেবে দেখানো হয়নি; বরং দেখানো হয়েছে যে, এগুলো একেকটি পথ, যার শেষ গন্তব্য ভিন্ন।
প্রথমত, সত্যবাদিতা মানুষকে ‘বিরর’ বা সৎকর্মের দিকে নিয়ে যায়। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি সত্য বলতে অভ্যস্ত, তার ভেতরে ধীরে ধীরে ন্যায়পরায়ণতা, আমানতদারিতা এবং তাকওয়া জন্ম নেয়। তার প্রতিটি কাজেই সততার ছাপ পড়ে। আর এই সৎকর্মই তাকে এক সময় জান্নাতের দিকে পরিচালিত করে। এখানে বোঝা যায়, জান্নাত কেবল বড় বড় আমলের ফল নয়; বরং ছোট ছোট সত্য কথার ধারাবাহিক চর্চাও একজন মানুষকে জান্নাতের উপর্যুক্ত করে তোলে।
দ্বিতীয়ত, হাদীসে বলা হয়েছে- মানুষ যখন বারবার সত্য কথা বলে, তখন তার নাম ‘সিদ্দীক’ হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়। এটি একটি উচ্চ মর্যাদা, যা নবীদের পরেই স্থান পায় (সূরা নিসা, আয়াত : ৬৯)। অর্থাৎ, সত্য বলা শুধু একটি অভ্যাস নয়; এটি এক সময় মানুষের পরিচয়ে পরিণত হয়, যা আল্লাহর নিকট স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত থাকে।
অন্যদিকে, মিথ্যার ক্ষেত্রেও একই ধারাবাহিকতা কাজ করে। একটি মিথ্যা আরেকটি মিথ্যার জন্ম দেয়, এবং তা মানুষকে ‘ফুজুর’ বা পাপাচারের দিকে ঠেলে দেয়। যখন কেউ নিয়মিত মিথ্যা বলে, তখন তার বিবেক দুর্বল হয়ে পড়ে, গুনাহ তার কাছে স্বাভাবিক হয়ে যায়। এভাবেই সে ধীরে ধীরে জাহান্নামের পথে অগ্রসর হয়।
সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো; মিথ্যা বলতে বলতে একসময় মানুষ ‘কাজ্জাব’ বা মহামিথ্যাবাদী হিসেবে আল্লাহর কাছে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। এটি শুধু একটি দুনিয়াবি বদনাম নয়; বরং আখিরাতের জন্য এক মারাত্মক পরিণতির ঘোষণা।
এই হাদীস আমাদের শেখায়; সত্য ও মিথ্যা কখনো নিরপেক্ষ নয়। প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য আমাদেরকে একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তাই আমাদের উচিত, কথাবার্তা, লেনদেন, প্রতিশ্রুতি- সবকিছুতে সত্যকে আঁকড়ে ধরা। কারণ, একটি সত্য কথা হয়তো ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর কাছে সেটিই হতে পারে জান্নাতের পথে একটি বড় পদক্ষেপ।
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে মিথ্যা পরিহার করে সত্যের পথে জীবনাচার করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
saifpas352@gmail.com



