পম্পেই : পাপাচার, প্রাচুর্য ও পতনের কাহিনি

সংগৃহীত ছবি
ইতিহাসের পাতায় নজর রাখলে দেখতে পাওয়ায়; কিছু নগরী তার সমৃদ্ধি ও সৌন্দর্য মানুষকে অবাক করে দেয়। আবার কিছু নগরী স্মরণীয় হয়ে থাকে তার ধ্বংসের কারণে। ইতালির পম্পেই তেমনই এক নগরী। একসময় বিত্ত-বৈভব, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনোদনের জন্য খ্যাত এই শহর মাত্র কয়েক ঘণ্টার ভয়াবহ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। আজও ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে উঠে আসে সেই নগরীর মানুষের জীবনযাপন, ভোগ-বিলাস ও নৈতিক অবক্ষয়ের নানা চিত্র।
পবিত্র কোরআনে অতীতের বহু জনপদের ধ্বংসের কথা উল্লেখ করে মানুষকে শিক্ষা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আমি ধ্বংস করেছি কত জনপদ, যার অধিবাসীরা ছিল জালিম এবং তাদের পরে সৃষ্টি করেছি অন্য জাতি।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ১১) তবে পম্পেই নগরীর নাম কোরআন বা হাদিসে সরাসরি উল্লেখ নেই। তাই এর ধ্বংসকে সরাসরি আল্লাহর শাস্তি হিসেবে চূড়ান্তভাবে দাবি করার সুযোগ নেই। কিন্তু ইতিহাসের এই ভয়াবহ পরিণতি মানুষকে পাপ, নৈতিক অবক্ষয় ও দুনিয়ার মোহের পরিণতি নিয়ে ভাবার সুযোগ করে দেয়।
ভূমধ্যসাগরের তীরে নেপলসের কাছাকাছি ভিসুভিয়াস পর্বতের পাদদেশে গড়ে উঠেছিল পম্পেই নগরী। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ বা সপ্তম শতাব্দী থেকেই এর বিকাশ শুরু হয়। পরে রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে এসে শহরটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়। অভিজাত রোমানদের বিলাসবহুল বাসস্থান, দৃষ্টিনন্দন অট্টালিকা, বাগান, স্নানাগার, থিয়েটার ও বিনোদনকেন্দ্রে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে পম্পেই। ধন-সম্পদ ও প্রাচুর্যের কারণে এটি পরিণত হয়েছিল তৎকালীন অভিজাতদের আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রে।
কিন্তু পম্পেইয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন শুধু তার সমৃদ্ধির গল্প বলে না, তুলে ধরে সমাজের নৈতিক অবক্ষয়েরও নানা চিত্র। খননকাজে পাওয়া গেছে অসংখ্য যৌনচিত্র, পতিতালয় ও যৌনতার সঙ্গে সম্পর্কিত স্থাপনা। শহরের বিভিন্ন স্থানে পাওয়া দেয়ালচিত্র ও ভাস্কর্য থেকে বোঝা যায়, যৌনতা ও ভোগ-বিলাসের প্রকাশ্য চর্চা সেখানে সামাজিক জীবনের একটি অংশ হয়ে উঠেছিল। একই সঙ্গে রোমানদের জনপ্রিয় গ্ল্যাডিয়েটর খেলায় মানুষ ও পশুর প্রাণঘাতী লড়াই কিংবা মানুষের সঙ্গে মানুষের মরণপণ সংঘর্ষ বিনোদনের উপাদানে পরিণত হয়েছিল। অর্থাৎ জীবন ও মানবিকতার মূল্য অনেক ক্ষেত্রে চিত্তবিনোদনের কাছে তুচ্ছ হয়ে পড়েছিল।
এরপর আসে সেই ভয়াবহ দিন। খ্রিস্টীয় ৭৯ সালের কোনো এক সময়ে ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরিতে শুরু হয় প্রচণ্ড অগ্ন্যুৎপাত। অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয় ছাই, পাথর ও উত্তপ্ত গ্যাসে পম্পেই ঢেকে যায়। পালানোর সুযোগও পায়নি বহু মানুষ। শহরের ভবন, রাস্তাঘাট, দোকানপাট, ঘরবাড়ি এবং মানুষের শেষ মুহূর্তের অবস্থান পর্যন্ত আগ্নেয় ছাইয়ের নিচে চলে যায়। প্রকৃতির এই আকস্মিক বিপর্যয় পম্পেইকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একটি সমৃদ্ধ নগরী থেকে পরিণত করে মৃত্যুর নগরীতে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকার পর অষ্টাদশ শতাব্দীতে পম্পেইয়ের ধ্বংসাবশেষের খনন শুরু হয়। এরপর পৃথিবীর সামনে উন্মোচিত হতে থাকে প্রায় দুই হাজার বছর আগের একটি নগরীর জীবনচিত্র। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, দোকান, চিত্রকর্ম এবং মানুষের দেহের ছাপ থেকে জানা যায় তাদের জীবনযাপন ও সংস্কৃতির নানা দিক।
আজ পম্পেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। তার ধ্বংসাবশেষ দেখতে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক পর্যটক সেখানে যান। কিন্তু পম্পেই শুধু পর্যটনের স্থান নয়, ইতিহাসের একটি নীরব শিক্ষালয়ও। তার ধ্বংসস্তূপ যেন মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, দুনিয়ার সম্পদ, প্রাচুর্য ও ভোগ-বিলাস চিরস্থায়ী নয়। একটি সমাজ যখন নৈতিকতা, মানবিকতা ও স্রষ্টার বিধানের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ে, তখন তার বাহ্যিক জৌলুস তাকে প্রকৃত নিরাপত্তা দিতে পারে না। তাই অতীতের ধ্বংসাবশেষ দেখে শুধু বিস্মিত না হয়ে নিজেদের জীবন ও সমাজের দিকে ফিরে তাকানোই বুদ্ধিমানের কাজ।



