বিনয় মানুষের মর্যাদা বাড়ায়

সংগৃহীত ছবি
মানুষের মর্যাদা কি সম্পদে, ক্ষমতায়, নাকি খ্যাতিতে? আধুনিক সমাজে অনেকেই বাহ্যিক সাফল্যকেই সম্মানের মাপকাঠি মনে করেন। অথচ ইসলাম মানুষকে ভিন্ন এক মানদণ্ডের শিক্ষা দেয়। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত মর্যাদা অর্জিত হয় আল্লাহভীতি, উত্তম চরিত্র ও বিনয়ের মাধ্যমে। যে ব্যক্তি নিজেকে বড় মনে না করে মানুষের সঙ্গে নম্র আচরণ করে, আল্লাহ তার মর্যাদা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জায়গাতেই বৃদ্ধি করে দেন।
বিনয় শুধু একটি নৈতিক গুণ নয়; এটি একজন মুমিনের পরিচয়ের অংশ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘পরম করুণাময়ের বান্দা তারা, যারা পৃথিবীতে বিনয়ের সঙ্গে চলাফেরা করে; আর যখন অজ্ঞ লোকেরা তাদের উদ্দেশে কটু কথা বলে, তখন তারা শান্তির কথা বলে।’ (সুরা আল-ফুরকান, আয়াত : ৬৩)। তার বিপরীতে অহংকারের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘মানুষের প্রতি অবজ্ঞাভরে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে চলাফেরা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো অহংকারী ও আত্মগর্বীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা লুকমান, আয়াত : ১৮)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন বিনয়ের জীবন্ত প্রতীক। মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হয়েও তিনি নিজ হাতে জুতা সেলাই করতেন, পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতেন, অসুস্থের খোঁজ নিতেন, শিশুদের সালাম দিতেন এবং দরিদ্রদের সঙ্গে একই কাতারে বসে আহার করতেন। তাঁর জীবন প্রমাণ করে, মহান হওয়ার জন্য নিজেকে বড় করে দেখানো নয়, বরং অন্যকে সম্মান দেওয়াই প্রকৃত মহত্ত্ব।
তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনয় অবলম্বন করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৮)। এর বিপরীতে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ‘যার অন্তরে অণুপরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (মুসলিম, হাদিস: ৯১)। এই দুটি হাদিস একসঙ্গে আমাদের শেখায়, বিনয় যেমন সম্মানের পথ, তেমনি অহংকার ধ্বংসের কারণ।
খোলাফায়ে রাশেদিনের জীবনেও বিনয়ের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করতেন। রাতের অন্ধকারে তিনি মানুষের ঘরে ঘরে খোঁজ নিতেন, ক্ষুধার্ত পরিবারের জন্য নিজের কাঁধে খাদ্যের বস্তা বহন করতেন। ইতিহাসবিদ ইবন কাসির তার আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে এসব ঘটনার বর্ণনা করেছেন। নেতৃত্বের এই বিনয়ই তাকে মানুষের হৃদয়ে অমর করে রেখেছে।
বর্তমান সময়ে আত্মপ্রচার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে বড় করে উপস্থাপন এবং ভোগবাদী প্রতিযোগিতা মানুষের মধ্যে অহমিকা বাড়িয়ে তুলছে। ফলে পারিবারিক সম্পর্ক দুর্বল হচ্ছে, কর্মক্ষেত্রে সহযোগিতার পরিবর্তে প্রতিযোগিতা বাড়ছে এবং সমাজে সহমর্মিতা কমে যাচ্ছে। অথচ একজন বিনয়ী মানুষ সহজেই মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করেন। বিনয় মানুষের ব্যক্তিত্বকে ছোট করে না; বরং তাকে আরও গ্রহণযোগ্য, সম্মানিত ও প্রভাবশালী করে তোলে।
ইমাম নববী (রহ.) বিনয়ের ব্যাখ্যায় বলেছেন, ‘বিনয় হলো সত্যকে গ্রহণ করা এবং মানুষকে তুচ্ছ মনে না করা।’ (শারহু সহিহ মুসলিম)। অর্থাৎ বিনয় মানে নিজের যোগ্যতা অস্বীকার করা নয়; বরং আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ থাকা এবং মানুষের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা।
আজকের পৃথিবীতে বিনয়কে অনেক সময় দুর্বলতা মনে করা হয়। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো, বিনয় দুর্বলতার নয়, বরং আত্মবিশ্বাস ও ঈমানী শক্তির প্রকাশ। যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয়, মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে এবং অহংকার থেকে নিজেকে দূরে রাখে, আল্লাহ তার মর্যাদা এমনভাবে বৃদ্ধি করেন, যা কোনো পদ, সম্পদ বা ক্ষমতা দিয়ে অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই একজন মুমিনের প্রকৃত সৌন্দর্য তার পোশাকে নয়, তার বিনয়ী চরিত্রেই প্রকাশ পায়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com




