পারমাণবিক বিভীষিকা ও ইসলামের সতর্কবাণী

প্রতীকী ছবি
আজ ৬ আগস্ট, হিরোশিমা দিবস। ১৯৪৫ সালের এই দিনে জাপানের হিরোশিমা শহরের ওপর ইতিহাসের প্রথম যুদ্ধকালীন পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়। তিন দিন পর নাগাসাকিতেও দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়। আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি (ICRC), জাতিসংঘ এবং হিরোশিমা পিস মেমোরিয়াল মিউজিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ড ও পরবর্তী তেজস্ক্রিয়তার কারণে কয়েক লাখ মানুষ প্রাণ হারান বা দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির শিকার হন। তাই হিরোশিমা দিবস কেবল একটি ঐতিহাসিক স্মরণদিবস নয়; এটি যুদ্ধ, সহিংসতা এবং গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ভয়াবহতা সম্পর্কে মানবজাতির জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা।
ইসলাম মানুষের জীবনকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো প্রাণকে হত্যা করল, অথচ সে হত্যা বা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টির অপরাধে দোষী ছিল না, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই হত্যা করল। আর যে একজনের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত আয়াত : ৩২)
ইমাম ইবন কাসির (রহ.) তার তাফসিরুল কোরআনিল আজিমে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন, নিরপরাধ মানুষের জীবনহানি ইসলামের দৃষ্টিতে এমন জঘন্য অপরাধ, যার প্রভাব গোটা মানবসমাজের ওপর পড়ে। এ কারণে ইসলাম জীবনরক্ষাকে অন্যতম সর্বোচ্চ শরিয়তী উদ্দেশ্য (হিফযুন নাফস) হিসেবে গণ্য করেছে।
পারমাণবিক অস্ত্রের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, এটি যোদ্ধা ও অযোদ্ধার মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না। নারী, শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ, চিকিৎসাকর্মী, এমনকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এর ক্ষতি থেকে রক্ষা পায় না। অথচ ইসলামে যুদ্ধেরও নৈতিক বিধান রয়েছে। আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা.) বর্ণনা করেন, এক যুদ্ধে নিহত এক নারীর লাশ দেখে রাসুলুল্লাহ (সা.) নারী ও শিশু হত্যা করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেন। (বুখারি, হাদিস: ৩০১৫; মুসলিম, হাদিস: ১৭৪৪))
ইমাম নববী (রহ.) শারহু সহিহ মুসলিম-এ লিখেছেন, এই হাদিস প্রমাণ করে যে যুদ্ধের লক্ষ্য কেবল যুদ্ধরত শক্তি; নিরপরাধ সাধারণ মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানানো ইসলামের নীতির পরিপন্থী।
ইসলাম শুধু মানুষ হত্যাই নয়, অকারণে ধ্বংসযজ্ঞও নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘পৃথিবীতে সংশোধনের পর সেখানে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ৫৬)
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের কারণে স্থল ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে।’ (সুরা রূম, আয়াত : ৪১)
ইমাম কুরতুবি (রহ.) আল-জামি‘ লি আহকামিল কুরআন-এ উল্লেখ করেছেন, ‘ফাসাদ’ বা বিপর্যয় এমন সব কাজকে বোঝায়, যা মানুষের জীবন, সম্পদ, পরিবেশ ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ক্ষতি করে। পারমাণবিক যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ এই নীতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
ইসলাম শান্তিকে দুর্বলতার পরিচয় নয়, বরং ন্যায়ভিত্তিক শক্তির প্রকাশ হিসেবে দেখে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘যদি তারা শান্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে তুমিও শান্তির দিকে ঝুঁকে পড়ো এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’ (সুরা আনফাল, আয়াত : ৬১)
শায়খ আবদুর রহমান আস-সা‘দি (রহ.) তার তাইসিরুল কারিমির রহমান গ্রন্থে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, যেখানে ন্যায়সঙ্গত শান্তির সুযোগ সৃষ্টি হয়, সেখানে সংঘাত দীর্ঘায়িত করা ইসলামের উদ্দেশ্য নয়; বরং শান্তি প্রতিষ্ঠাই কাম্য।
খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগেও যুদ্ধনীতিতে মানবিকতার এই আদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে। খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.) সেনাবাহিনীকে বিদায় দেওয়ার সময় নির্দেশ দিয়েছিলেন, তোমরা নারী, শিশু ও বৃদ্ধকে হত্যা করবে না; ফলদ বৃক্ষ কাটবে না; জনপদ অকারণে ধ্বংস করবে না।
হিরোশিমা দিবস মুসলমানদের জন্যও আত্মসমালোচনার একটি উপলক্ষ। কারণ ইসলাম এমন একটি সভ্যতার শিক্ষা দেয়, যেখানে শক্তির চেয়ে ন্যায়, প্রতিশোধের চেয়ে দয়া এবং ধ্বংসের চেয়ে জীবনরক্ষাকে অধিক মূল্য দেওয়া হয়। যুদ্ধ কখনো কখনো অনিবার্য হতে পারে, কিন্তু যুদ্ধেরও নৈতিক সীমারেখা আছে। সেই সীমারেখা অতিক্রম করে নির্বিচারে মানুষ, প্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংস করে এমন কোনো কর্মকাণ্ড ইসলামের ন্যায় ও মানবতার চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আজ হিরোশিমা দিবসে বিশ্ব যখন পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহ পরিণতি স্মরণ করছে, তখন কোরআনের এই আহ্বান আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে: ‘আল্লাহ শান্তির আবাসের দিকে আহ্বান করেন এবং যাকে ইচ্ছা সরল পথের দিকে পরিচালিত করেন।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত : ২৫)
মানবসভ্যতার নিরাপত্তা কেবল শক্তির ভারসাম্যে নয়, বরং ন্যায়বিচার, মানবমর্যাদা ও শান্তির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মধ্যেই নিহিত। হিরোশিমার ধ্বংসস্তূপ সেই সত্য আজও মানবজাতিকে স্মরণ করিয়ে দেয়, আর ইসলাম সেই পথেই মানুষকে আহ্বান জানায়।



