মুসলিম বীর সেনানী
পারস্য সাম্রাজ্য বিজেতা সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ইসলামের প্রথম যুগ শুধু বিশ্বাসের ইতিহাস নয়, এটি ছিল এমন একসময়, যখন একজন মানুষ তার ইমান দিয়ে পুরো সভ্যতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারতেন। সেই যুগেরই এক উজ্জ্বল নাম সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)। তিনি ছিলেন প্রথমদিকের ইসলাম গ্রহণকারীদের একজন, দোয়া কবুলপ্রাপ্ত সাহাবি এবং পারস্য সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম প্রধান স্থপতি।
পুরো নাম সা’দ ইবনে মালিক ইবনে উহাইব আল-জুুহরি। তিনি কুরাইশের বনু জুুহরা গোত্রের সন্তান। তিনি মহানবী (সা.)-এর সম্মানিত মা আমিনা বিনতে ওয়াহবের আত্মীয় হওয়ার সুবাদে নবীজির চাচা সম্পর্কীয় ছিলেন। (ইবন সা’দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, খণ্ড-৩)
ইসলাম গ্রহণ ও মায়ের পরীক্ষার ঘটনা
সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) মাত্র ১৭ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন সেই তিনজন সাহাবির একজন, যারা প্রথম প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। (বুখারি, হাদিস : ৩৭২৮)
তার ইসলাম গ্রহণের পর সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো, তার মায়ের বিরোধিতা। মা শপথ করেন, যতক্ষণ না তিনি ইসলাম ত্যাগ করেন, ততক্ষণ তিনি খাবেন না, পান করবেন না। তখন সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) দৃঢ়ভাবে বললেন—‘হে মা, তুমি যদি একশ প্রাণও রাখো এবং এক এক করে তা বের হয়ে যায়, তবু আমি ইসলাম ত্যাগ করব না।’ (আত-তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক)
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোরআনে আয়াত নাজিল হয়— ‘আর যদি তারা তোমাকে আমার সঙ্গে এমন কিছু শরিক করতে বাধ্য করে, যার জ্ঞান তোমার নেই, তবে তাদের আনুগত্য করো না…’ (সুরা লোকমান, আয়াত : ১৫)
দোয়া কবুলের সুসংবাদ
নবীজি (সা.) সা’দ (রা.)-এর জন্য বিশেষভাবে দোয়া করেছিলেন— ‘হে আল্লাহ, তার দোয়া কবুল করো।’ (বুখারি, হাদিস : ২৭৫৩) এই দোয়ার কারণে তিনি পরে ‘মুস্তাজাবুদ দাওয়াহ’ বা দোয়া কবুলপ্রাপ্ত সাহাবি হিসেবে পরিচিত হন। সাহাবিদের মধ্যে এটি ছিল একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য।
বদর, উহুদ ও তীরন্দাজি
সা’দ (রা.) ছিলেন ইসলামের প্রথম তীরন্দাজদের একজন। বদরের যুদ্ধে তিনি অংশ নেন এবং উহুদের যুদ্ধে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উহুদের যুদ্ধে নবীজি (সা.) তাকে বললেন— ‘তীর ছোড়, আমার মা-বাবা তোমার জন্য কোরবান হোক।’ (বুখারি, হাদিস : ৪০৬১) নবীজির জবানে এমন কঠিন কথা এটি একমাত্র সাহাবি সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়েছে বলে ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখ করা হয়।
কাদিসিয়ার যুদ্ধ ও পারস্য বিজয়
সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) জীবনের সবচেয়ে বড় সামরিক অবদান আসে কাদিসিয়ার যুদ্ধে। তিনি ছিলেন মুসলিম বাহিনীর প্রধান সেনাপতি। রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের মধ্যে পারস্য ছিল অন্যতম শক্তিশালী সাম্রাজ্য। আনুমানিক ৩০,০০০ মুসলিম সৈন্য বনাম প্রায় ১,২০,০০০ পারস্য বাহিনীর মধ্যে সংঘটিত এই যুদ্ধে মুসলিমরা বিজয় লাভ করে। (তারিখে তাবারি, খণ্ড-৪)
এই যুদ্ধের পর পারস্য সাম্রাজ্যের পতনের পথ উন্মুক্ত হয়, যা ইসলামের ইতিহাসে এটি একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত।
কুফা নগর প্রতিষ্ঠা
উমর (রা.)-এর নির্দেশে সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) ইরাকে কুফা নগর প্রতিষ্ঠা করেন। এটি পরে ইসলামি জ্ঞানচর্চা ও প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। (আল-বালাজুরি, ফুতুহুল বুলদান)।
তার প্রশাসনিক দক্ষতা যুদ্ধক্ষেত্রের মতোই প্রশংসিত ছিল।
জীবনের শেষ সময়
সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) জীবনের শেষ অংশ কাটান মদিনার বাইরে আকিক উপত্যকায়। তিনি ফিতনা-ফ্যাসাদ থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নেন এবং বললেন— ‘আমি এমন একটি জীবন চাই, যেখানে আমি মানুষ ও ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকি।’ তিনি ৫৫ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন। (ইবন কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ৮)
সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর জীবন ছিল ইমান, ত্যাগ, দোয়া ও কৌশলের এক অনন্য সমন্বয়। তিনি ছিলেন সেই মানুষ, যার তীর শুধু শত্রুকে নয়, ইতিহাসের গতিপথকেও বদলে দিয়েছিল। তার জীবন আমাদের শেখায়; দৃঢ় বিশ্বাস, মা-বাবার পরীক্ষায় অটল থাকা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা মানুষকে কীভাবে ইতিহাসের অংশ নয়, ইতিহাসের নির্মাতা বানিয়ে দিতে পারে।



