গোপন আমল যেভাবে ব্যক্তির মর্যাদা বৃদ্ধি করে

প্রতীকী ছবি
মানুষ সাধারণত এমন কাজকেই বেশি মূল্য দেয়, যা অন্যের চোখে পড়ে। অথচ ইসলামে এমন এক শ্রেণির আমলের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে, যা মানুষ দেখে না, জানেও না, কিন্তু আল্লাহ তা দেখেন এবং তার প্রতিদান দেন। এ ধরনের ইবাদত ও সৎকর্মকে বলা হয় গোপন আমল। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে লোকদেখানো বা প্রশংসার আশা ছাড়া যে আমল করা হয়, সেটিই গোপন আমলের প্রকৃত পরিচয়। ইসলামে এ ধরনের আমল ব্যক্তির ঈমান, আন্তরিকতা ও তাকওয়ার অন্যতম প্রমাণ।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা যদি প্রকাশ্যে দান কর, তবে তা ভালো। আর যদি তা গোপনে অভাবগ্রস্তদের দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৭১)। এই আয়াত প্রমাণ করে যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে গোপন আমলের মূল্য প্রকাশ্য আমলের চেয়েও বেশি, কারণ এতে রিয়া বা লোকদেখানোর আশঙ্কা থাকে না।
ইসলামে সব আমলের ভিত্তি হলো ইখলাস বা একনিষ্ঠতা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সব কাজের ফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (বুখারি, হাদিস: ১)। গোপন আমল মানুষকে নিয়ত শুদ্ধ রাখতে সাহায্য করে। কারণ এখানে মানুষের প্রশংসা পাওয়ার সুযোগ নেই, আছে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আকাঙ্ক্ষা।
কিয়ামতের কঠিন দিনে সাত শ্রেণির মানুষ আল্লাহর আরশের ছায়া লাভ করবে। তাদের একজন হলেন, "যিনি এমনভাবে দান করেন যে, তার ডান হাত যা ব্যয় করে, বাম হাতও তা জানে না।’ (বুখারি, হাদিস: ১৪২১)। এই হাদিস গোপন আমলের সর্বোচ্চ মর্যাদার একটি স্পষ্ট প্রমাণ।
ইসলামের ইতিহাসে বহু নেককার ব্যক্তির জীবনে গোপন আমলের প্রভাব দেখা যায়। খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) রাতের অন্ধকারে মানুষের ঘরে খাদ্য পৌঁছে দিতেন। অনেকেই জানতেন না, তাদের সাহায্যকারী কে। আবার আলী ইবনুল হুসাইন (রহ.)-এর মৃত্যুর পর মানুষ জানতে পারে, রাতের আঁধারে অসংখ্য দরিদ্র পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব তিনি নিতেন। তাঁর মৃত্যুর পরই সেই সহায়তা বন্ধ হয়ে গেলে মানুষ বিষয়টি বুঝতে পারে। এসব ঘটনা দেখায়, গোপন আমল মানুষের কাছে নয়, আল্লাহর কাছে মর্যাদা বৃদ্ধি করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহর আরশের ছায়া লাভকারীদের মধ্যে সেই ব্যক্তিও রয়েছেন, ‘যিনি নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করেন, ফলে তার দুই চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে যায়।’ (বুখারি, হাদিস: ৬৬০)। মানুষের সামনে নয়, একান্তে আল্লাহর ভয়ে কাঁদা হৃদয়ের বিশুদ্ধতারই পরিচয় বহন করে।
সালাফে সালেহিন গোপন আমলকে ঈমান রক্ষার অন্যতম উপায় মনে করতেন। আইয়ুব আস-সাখতিয়ানী (রহ.) কোরআন তিলাওয়াত করতে গিয়ে কেঁদে ফেললে মানুষের সামনে তা প্রকাশ না করার চেষ্টা করতেন। মুহাম্মদ ইবন ওয়াসি (রহ.) সম্পর্কে বলা হয়, তিনি এমনভাবে রাতভর ইবাদত করতেন যে, তার পরিবারের অনেকেই তা জানতেন না। তারা বিশ্বাস করতেন, মানুষের অজানা আমলই আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।
আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে প্রতিটি ভালো কাজ প্রকাশ করার প্রবণতা বেড়েছে। যদিও সব ক্ষেত্রে তা নিষিদ্ধ নয়, তবে একজন মুমিনের উচিত এমন কিছু আমল নিজের ও আল্লাহর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা। যেমন, নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়া, গোপনে দান করা, কাউকে না জানিয়ে কোনো অভাবীর চিকিৎসার ব্যয় বহন করা, নির্জনে কোরআন তিলাওয়াত করা বা অন্যের জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করা। এসব আমল মানুষের করতালি এনে না দিলেও; আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ প্রশস্ত করে দেয়।
গোপন আমল মানুষের কাছে পরিচিতি বাড়ানোর জন্য নয়; বরং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য। যে ব্যক্তি নিরবে, নিভৃতে, কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদত ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তার মর্যাদা দুনিয়া ও আখিরাতে উন্নত করেন। তাই প্রকাশ্য নেক আমলের পাশাপাশি প্রত্যেক মুসলিমের এমন কিছু গোপন আমল থাকা উচিত, যা কেবল আল্লাহই জানেন। হয়তো সেই অজানা আমলই কিয়ামতের দিন মুক্তি ও সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com




