অফিসের কর্মঘণ্টাও গুরুত্বপূর্ণ আমানত

প্রতীকী ছবি
অফিসে নির্ধারিত কর্মঘন্টাগুলোকে কেউ দেখেন চাকরির নির্ধারিত সময় হিসেবে, কেউ দেখেন জীবিকার জন্য সংগ্রামের সাত বা আট ঘণ্টা হিসেবে। কিন্তু মহান আল্লাহকে ভয় করেন এমন একজন মুমিনের কাছে এই সময় শুধু বেতন পাওয়ার বিনিময়ে ব্যয় করা কয়েকটি ঘণ্টা নয়; এর প্রতিটি মুহূর্ত একটি আমানত। কারণ কর্মস্থলে যে সময়ের জন্য একজন মানুষ পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন, সেই সময়ের দায়িত্বও তার ওপর অর্পিত হয়।
ইসলাম আমানত রক্ষাকে ঈমানি চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখেছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা আমানত তার হকদারকে পৌঁছে দাও।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৫৮)। আয়াতটি শুধু কারও কাছে রাখা অর্থ-সম্পদের আমানতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; দায়িত্ব, কর্তব্য ও অর্পিত কাজও আমানতের অন্তর্ভুক্ত।
চাকরির ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্ট। একজন কর্মী নির্দিষ্ট সময় অফিসে থাকার এবং নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের জন্য বেতন নেন। তাই অফিসের কর্মঘণ্টা ব্যক্তিগত অবসর কাটানোর সময় নয়। দীর্ঘ সময় ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা, অপ্রয়োজনীয় আড্ডায় কর্মঘণ্টা পার করা, ব্যক্তিগত ব্যবসা বা কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকা কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে দায়িত্বে গাফিলতি করা সময়ের আমানতের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ।
পবিত্র কোরআন মুমিনদের একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে আমানত ও অঙ্গীকার রক্ষার কথা বলেছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আর যারা তাদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত : ৮)। অর্থাৎ একজন মুসলিমের সততা শুধু মসজিদে তার ইবাদতের মাধ্যমে প্রকাশ পায় না; অফিসের ডেস্কে বসে সে কতটা দায়িত্বশীল, সেটিও তার চরিত্রের পরিচয়।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। কর্মঘণ্টা নষ্ট করার অর্থ শুধু নিজের সময় নষ্ট করা নয়। এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ, সহকর্মীদের সময় এবং সেবাগ্রহীতার অধিকারও জড়িয়ে থাকতে পারে। একজন কর্মীর অবহেলার কারণে কোনো ফাইল আটকে যেতে পারে, কোনো রোগীকে অপেক্ষা করতে হতে পারে, কোনো গ্রাহক সেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। ফলে ব্যক্তিগত গাফিলতি কখনো কখনো অন্যের অধিকারের ওপরও প্রভাব ফেলে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৮৯৩)। এই হাদিসের আলোকে প্রমাণিত হয়যে, একজন কর্মীও তার দায়িত্বের জায়গায় একজন আমানতদার। তার ওপর অর্পিত কাজ সম্পর্কে তাকে শুধু প্রতিষ্ঠানের কাছেই নয়, আল্লাহর কাছেও জবাবদিহি করতে হবে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কর্মী অফিসে যন্ত্রের মতো নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতেই থাকবে। বৈধ বিশ্রাম, নামাজের বিরতি, প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত কাজ বা কর্মস্থলের স্বীকৃত বিরতি অবশ্যই আলাদা বিষয়। ইসলাম মানুষকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেয় না। কিন্তু অনুমোদিত বিরতি আর দায়িত্ব ফাঁকি দেওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
একজন মুসলিম কর্মীর সৌন্দর্য এখানেই যে, তাকে নজরদারি না করলেও সে দায়িত্বশীল থাকে। বস সামনে থাকলে কাজ করা আর বস চলে গেলে কাজ ফেলে রাখা সততার পরিচয় নয়। প্রকৃত আমানতদার সেই ব্যক্তি, যিনি জানেন, মানুষের চোখ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হলেও আল্লাহর দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
তাই কর্মস্থলে সময়মতো উপস্থিত হওয়া, নির্ধারিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা, অফিসের সম্পদ অপব্যবহার না করা, কর্মঘণ্টায় অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় নষ্ট না করা এবং দায়িত্ব শেষ না করে ইচ্ছাকৃতভাবে গাফিলতি না করা শুধু পেশাগত শৃঙ্খলা নয়, একজন মুসলিমের নৈতিক দায়িত্বও।
জীবিকার জন্য আমরা যে সময়টুকু বিক্রি করি, সেই সময়েরও একটি হক আছে। তাই বেতনের প্রতিটি টাকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দায়িত্ব পালনের প্রশ্ন। কর্মঘণ্টা শেষ হলে অফিসের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু আমানতের হিসাব বন্ধ হয় না। মানুষের কর্মজীবনও যে তার আখিরাতের পাথেয় হতে পারে, ইসলামের শিক্ষা আমাদের সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়।
মহান আল্লাহ আমাদের প্রত্যেককে স্ব স্ব কর্মক্ষেত্রে যথাযথ দায়িত্ব পালনের তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



