অনলাইন বুলিং ও ইসলামের কঠোর সতর্কবার্তা

প্রতীকী ছবি
ডিজিটাল যুগে মানুষের যোগাযোগ যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি বেড়েছে অপব্যবহারের ক্ষেত্রও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে অপমান করা, বিদ্রূপ করা, কটূক্তি করা, গুজব ছড়ানো, অশালীন মন্তব্য করা, ভয়ভীতি দেখানো কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করার আচরণকে বলা হয় অনলাইন বুলিং বা সাইবার বুলিং। অনেকেই এটিকে সামান্য বিনোদন বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মনে করলেও বাস্তবে এটি মানুষের সম্মান, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক জীবনে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের আচরণ শুধু অনৈতিকই নয়, বরং স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ।
ইসলাম মানুষের সম্মান ও মর্যাদাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِنْ قَوْمٍ... وَلَا تَلْمِزُوا أَنْفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ
‘হে মুমিনগণ! একদল মানুষ যেন অন্য দলকে বিদ্রূপ না করে... তোমরা একে অপরকে দোষারোপ করো না এবং পরস্পরকে মন্দ উপাধিতে ডেকো না।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১১)
এই আয়াতে বিদ্রূপ, অপমান ও কটূক্তি থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কাউকে ট্রল করা, ব্যঙ্গাত্মক মিম তৈরি করা বা অপমানজনক মন্তব্য করা এই নিষেধাজ্ঞারই অন্তর্ভুক্ত।
অনলাইন বুলিংয়ের আরেকটি ভয়াবহ রূপ হলো গিবত, অপবাদ ও গুজব ছড়িয়ে দেওয়া। অনেক সময় কোনো তথ্য যাচাই না করেই মানুষের বিরুদ্ধে পোস্ট বা মন্তব্য করা হয়, যা মুহূর্তেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا
‘হে মুমিনগণ! কোনো পাপাচারী ব্যক্তি যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে নাও।’ (সুরা আল-হুজুরাত, আয়াত : ৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন,
كَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ
‘কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে
তাই প্রচার করে।’
(মুসলিম, মুকাদ্দিমা, হাদিস ৫)
আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই ছাড়া পোস্ট শেয়ার করা, গুজব ছড়ানো বা কারও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করে তাকে হেয় করা এই হাদিসের সতর্কতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
ইসলাম শুধু কষ্ট দেওয়া নিষিদ্ধ করেনি, বরং একজন মুসলিমকে অন্য মুসলিমের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা হিসেবে তুলে ধরেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ
‘প্রকৃত মুসলিম সে, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।’ (বুখারি, হাদিস : ১০; মুসলিম, হাদিস : ৪০)
বর্তমান বাস্তবতায় ‘হাত’ বলতে কেবল শারীরিক আঘাত নয়, বরং মোবাইলের কীবোর্ডে লেখা অপমানজনক মন্তব্য বা স্ক্রিনে দেওয়া একটি পোস্টও বোঝানো যেতে পারে, যার মাধ্যমে অন্যের ক্ষতি করা হয়।
অনলাইন বুলিংয়ের শিকার অনেক মানুষ মানসিক অবসাদ, উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসহীনতা এমনকি আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্তের দিকেও ধাবিত হয়। তাই একটি ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য বা অপমানজনক পোস্টকে কখনোই তুচ্ছ মনে করা উচিত নয়। ইসলামে মানুষের ইজ্জত ও সম্মান রক্ষা করা একটি মৌলিক দায়িত্ব। বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছেন, মুসলমানের জীবন, সম্পদ ও সম্মান একে অপরের জন্য পবিত্র। (বুখারি, হাদিস : ১৭৩৯; মুসলিম, হাদিস : ১৬৭৯)
ডিজিটাল যুগে একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে অপমান, বিদ্বেষ ও বিভাজনের নয়; বরং সত্য, কল্যাণ ও সদাচার প্রচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা। কোনো পোস্ট, মন্তব্য বা ছবি প্রকাশের আগে নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত, এটি কি কারও সম্মান ক্ষুণ্ন করবে?
প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু ইসলামের নৈতিক শিক্ষা বদলায়নি। বাস্তব জীবনে যেমন কাউকে অপমান করা গুনাহ, তেমনি অনলাইনেও তা সমানভাবে গুনাহ। তাই একজন সচেতন মুসলিমের উচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন ভাষা ও আচরণ বেছে নেওয়া, যা ইসলামের সৌন্দর্য, মানবিকতা ও উত্তম চরিত্রের পরিচয় বহন করে। কারণ প্রতিটি শব্দই, তা মুখে উচ্চারিত হোক বা কীবোর্ডে লেখা হোক, আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত হচ্ছে এবং একদিন তার হিসাব দিতেই হবে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




