একসময়ের ‘জামায়াতবিরোধী’ অলিই জামায়াত জোটের প্রার্থী

কর্নেল অলি আহমদ বীরবিক্রম
একসময় জামায়াতে
ইসলামীর রাজনীতির ঘোর বিরোধী ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদ বীরবিক্রম। দলটির রাজনীতি
নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করতেন। বিভিন্ন সময় জামায়াতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানও নিতে
দেখা গেছে তাকে। সেই অলি আহমদই এখন জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী।
রাজনীতির পালাবদলে বদলে গেছে সম্পর্কের সমীকরণ। যে জামায়াত একসময় ছিল তার রাজনৈতিক
বিরোধিতার অন্যতম জায়গা, সেই জামায়াতের নেতৃত্বাধীন
জোটই এবার তাকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসানোর লড়াইয়ে সামনে এনেছে।
গতকাল রবিবার দুপুরে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে বসেছিল ১১ দলের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক। সেখানে তারা অলি আহমদের ব্যাপারেই একমত হন। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ১১ দলের প্রার্থী হচ্ছেন এলডিপি সভাপতি অলি আহমদ। আজ সোমবার নির্বাচন কমিশন থেকে ১১ দলের পক্ষে সংগ্রহ করা হবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মনোনয়নপত্র। কর্নেল অলি আহমদের পক্ষে জোটের সমন্বয়ক ড. হামিদুর রহমান আযাদ মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে পারেন বলে নিশ্চিত করেছে জোটের একাধিক সূত্র।
অলি আহমদকে সামনে আনার এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে নতুন একটি রাজনৈতিক সমীকরণও স্পষ্ট হলো। আর সেটি হলো, সংখ্যার হিসাবে জয়ের সম্ভাবনা ১১ দলের পক্ষে না থাকলেও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। লক্ষ্য— রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং বিএনপির বিপরীতে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করা।
মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে ‘বীরবিক্রম’ খেতাব পাওয়া অলি আহমদ পরবর্তী সময়ে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠেন। ১৯৮০ সালে সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৮১ সালের উপনির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর দীর্ঘ সময় বিএনপির রাজনীতিতে ছিলেন। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্বও পান তিনি।
সেই সময়কার অলি আহমদ আর আজকের অলি আহমদের রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে পার্থক্যটা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান জামায়াত প্রশ্নে। একসময় জামায়াতের কঠোর বিরোধিতা করা এই রাজনীতিক পরবর্তী সময়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের রাজনীতির অংশ হিসেবে জামায়াতের সঙ্গে একই রাজনৈতিক মঞ্চে আসেন। ১৮-দলীয় জোট পরে ২০-দলীয় জোটে রূপ নিলে তার নিজের দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ও জামায়াতে ইসলামী একই জোটের শরিক হয়ে বিভিন্ন আন্দোলন-কর্মসূচিতেও পাশাপাশি ছিল।
সময়ের সঙ্গে সেই রাজনৈতিক দূরত্ব আরও কমেছে। ২০১৯ সালে জামায়াত নিয়ে অলি আহমদের একটি মন্তব্যও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেয়। তিনি বলেছিলেন, ‘১৯৭১ সালের জামায়াত আর ২০১৯ সালের জামায়াত এক নয়। জামায়াত এখন পরিশুদ্ধ ও দেশপ্রেমিক।’
ওই
বক্তব্যের পর জামায়াত সম্পর্কে তার অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা হয়। এরপর রাজনীতির
আরও কয়েকটি বাঁক পেরিয়ে এবার অলি আহমদ সরাসরি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের রাষ্ট্রপতি
প্রার্থী। এই প্রার্থিতার পেছনে অবশ্য শুধু জামায়াত নয়, জোটের অন্য শরিকদেরও সমর্থন
রয়েছে। বৈঠকে ১১ দলের নেতারা সর্বসম্মতভাবে তার নাম অনুমোদন করেছেন। জোটের নেতাদের
বিবেচনায় অলি আহমদের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায়
তার পূর্ব অভিজ্ঞতা তাকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য উপযুক্ত করে তুলেছে।
অলি আহমদকে প্রার্থী করার ক্ষেত্রে তার রাজনৈতিক পরিচয়ও জোটের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে
উঠেছে। একদিকে তিনি মুক্তিযুদ্ধের খেতাবপ্রাপ্ত যোদ্ধা, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের সংসদীয়
রাজনীতির অভিজ্ঞ ব্যক্তি। বিএনপি সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, একাধিকবার
সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং প্রায় পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক
বাঁক দেখেছেন। এ অভিজ্ঞতাই তাকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য আলাদা করে তুলেছে।
জামায়াত
জোটের অন্যতম শরিক জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি ও দলীয় মুখপাত্র রাশেদ
প্রধান আগামীর সময়কে বললেন, ‘অলি আহমদকে প্রার্থী করার মধ্য দিয়ে আমরা সম্মান জানিয়েছি।
নির্বাচন থেকে শুরু করে জোটে তার অবদান কম নয়। একই সঙ্গে আমরা মনে করছি, রাষ্ট্রপতি
প্রার্থী হিসেবে তিনিই সবচেয়ে যোগ্য।’
জোটের সিদ্ধান্ত ঘোষণার সময় নাহিদ ইসলাম বলছিলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার
মধ্য দিয়ে তারা একটি রাজনৈতিক বার্তা দিতে চান। তারা মনে করেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক হওয়া উচিত। এই নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়েও ১১ দলের
আপত্তি রয়েছে। তাদের প্রত্যাশা ছিল, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পর সংবিধান সংস্কার করে
নতুন কাঠামোর অধীনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা হবে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া না হওয়ায় বিদ্যমান
সাংবিধানিক ব্যবস্থার মধ্যেই নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যেও প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টি সামনে এসেছে। তার মতে, গণতন্ত্রের স্বার্থে রাজনীতির সবক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা থাকা প্রয়োজন। আর সেই জায়গা থেকেই ১১ দল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
৩৪৯
সদস্যের সংসদে বিএনপির সদস্য ২৪৭ জন। বিপরীতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের সদস্য ৯০ জন।
স্বতন্ত্র ও অন্যান্য দলের সদস্য রয়েছেন আরও কয়েকজন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হতে
প্রয়োজন সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট। ফলে সংসদীয় হিসাবের দিক থেকে বিএনপির প্রার্থীর জয় অনেকটাই
নিশ্চিত। ভোটের অঙ্কে পিছিয়ে থেকেও অলি আহমদকে সামনে রেখে নির্বাচনী মাঠে থাকার সিদ্ধান্ত
নিয়েছে ১১ দল।
নিজের নাম ঘোষণার পর অলি আহমদও জোটের নেতাদের প্রতি জানালেন কৃতজ্ঞতা। তিনি বলছিলেন,
একজন মুক্তিযোদ্ধা ও পরীক্ষিত ব্যক্তি হিসেবে এবং তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা শিক্ষাগত
যোগ্যতা নিয়ে কোনো অভিযোগ না থাকায় ১১ দলের নেতারা তাকে বেছে নিয়েছেন। নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের
চেয়ে জনগণের স্বার্থ রক্ষাই তার কাছে বড়।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসেরআমির আল্লামা মামুনুল হক মনে করেন, অলি আহমদ মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের যোদ্ধা, বর্ষীয়ান রাজনীতিক এবং বর্তমান রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরীক্ষিত ব্যক্তি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ইতিহাসেও এবারের নির্বাচন আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। ১৯৯১ সালের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশ তৈরি হয়নি। পরবর্তী সাতটি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯১ সালে বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থনে আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট। দীর্ঘ সময় পর এবার আবারও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
জয়-পরাজয়ের পরিপ্রেক্ষিতে অলি আহমদও ভোটের অঙ্কের বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথাই সামনে এনেছেন। তিনি বললেন, ‘আমার থেকে যদি ভালো প্রার্থী থাকে, কেউ দিতে পারে আমরা সবাই আনন্দিত হব। আর যদি ভালো প্রার্থী না থাকে, আশা করব সরকারিপক্ষের (বিএনপি) যারা এমপি আছেন, তারা আমাদের ভোট দিয়ে দেশকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য সুযোগ সৃষ্টি করবেন।’
রাজনীতিতে অলি আহমদের এই অবস্থান পরিবর্তনকে অবশ্য বিস্ময়কর হলেও একেবারে নজিরবিহীন মনে করছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. স ম আলী রেজা আগামীর সময়কে বললেন, ‘কর্নেল অলি আহমদ একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তার দৃঢ় অবস্থান ও ব্যক্তিত্বের কারণে আলাদা একটি পরিচিতি তৈরি হয়েছে। তাকে দীর্ঘদিন জামায়াতবিরোধী হিসেবেই দেখা গেছে এবং তার অসংখ্য বক্তব্য-বিবৃতিতে প্রতিফলন রয়েছে।’
অলি আহমদের জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে যাওয়া এবং এখন সেই জোটের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হওয়াকে বিস্ময়কর উল্লেখ করে তিনি বললেন, ‘রাজনীতিতে এটি একেবারে নতুন কোনো ঘটনা নয়। সময়ের প্রয়োজনে রাজনৈতিক অবস্থান ও জোটের সমীকরণ বদলানোর নজির রয়েছে। এবারও সেটিই দেখছি।’




