আগামীর সময়

সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে নমনীয় জামায়াত, অনড় এনসিপি

সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে নমনীয় জামায়াত, অনড় এনসিপি

ফাইল ছবি

সরকারি দল বিএনপি সংসদে উত্থাপন না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাতিল হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতিতে পড়েছে গণভোট অধ্যাদেশ। আদৌ সরকারি দল সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেবে কিনা সেটিও প্রায় অনিশ্চিত। তবে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে একটি সর্বদলীয় বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে সরকারি দল। এতে পুরোপুরি সম্মতি না জানালেও নমনীয় ভাব দেখিয়েছে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

তবে গণভোট ও জুলাই সনদ অনুযায়ী সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিতে অনড় আছে তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হওয়ার কথা। এই আদেশ ও জুলাই সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পক্ষে গণভোটে রায় এসেছিল। এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করার কথা সংবিধান সংস্কার পরিষদের।

জুলাই আদেশে বলা হয়েছে, সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে যে পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হয়, একইভাবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করার বিধান রাখা হয়েছে। সেই অনুযায়ী গত ১৩ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতের পর (১৪ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু বিএনপি ও তার জোট থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়নি। তবে এ শপথ নিয়েছিলেন বিরোধী দলের সদস্যরা।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ শেষ হয়েছে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার সময়।

এদিকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান প্রশ্নে জাতীয় সংসদে বিতর্ক হলেও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। মঙ্গলবার এ–সংক্রান্ত এক মুলতবি প্রস্তাবের আলোচনায় সরকারি দল বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার একটি দলিল’। এই আদেশ সূচনা থেকেই অবৈধ। তাই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কোনো সুযোগ নেই। তবে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে একটি সর্বদলীয় বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে সরকারি দল।

অন্যদিকে বিরোধী দল বলছে, রাষ্ট্রপতিকে এই আদেশ জারির এখতিয়ার দিয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। গণভোটের মাধ্যমে যে জনরায় এসেছে, তা গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে সংসদ সম্মানিত হবে। সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাবের জবাবে বিরোধী দল বলেছে, ‘সংস্কার’ নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, এটাকে একটি বিশেষ জায়গায় পৌঁছানোর জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করা হলে, সেটা বিবেচনার বিষয় হতে পারত।

গতকাল মঙ্গলবার সংসদে প্রশ্নোত্তর ও ৭১ বিধির আলোচনা শেষে অন্য কার্যক্রম মুলতবি করে প্রস্তাবটির ওপর আলোচনা হয়। প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলছিলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ বৈধ আইন নয়। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিলের আগপর্যন্ত রাষ্ট্রপতি এমন আদেশ জারি করতে পারতেন। ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ গঠিত হওয়ার পর থেকে রাষ্ট্রপতির এই এখতিয়ার আর নেই। ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ আনা হয়নি। কারণ, এটা না অধ্যাদেশ, না আইন। এটি অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল।’

জুলাই আদেশ জারি করাকে এখতিয়ারবহির্ভূত দাবি করে সালাহউদ্দিন আহমদ জানালেন—রাষ্ট্রপতির কাছে জানতে চেয়েছিলাম, এমন আদেশ জারি করতে পারেন কিনা। জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, ‘আমি তো পারি না। আমাকে পারাচ্ছে।’ রাজহংসকে জোরপূর্বক স্বর্ণের ডিম পাড়তে বাধ্য করার মতো ঘটনা। এখন সেই ডিম্ব হয়েছে অবৈধ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য, সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। বিএনপির ইশতেহার সমর্থন করে ৫১ শতাংশ জনগণ ম্যান্ডেট দিয়েছেন। বিএনপি সরকারি দল ও বিরোধী দল সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সংশোধনী আনতে চায় সংবিধানের।

এ সময় সংসদ নেতা তারেক রহমানের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রস্তাবটি হলো— সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব দলের এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হবে। কমিটিতে সবাই মিলে আলোচনা করে সমঝোতার ভিত্তিতে উত্থাপন করা হবে সংবিধান সংশোধন বিল।

বিশেষ কমিটি গঠনের বিষয়ে সরকারি দলের প্রস্তাব প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন, আলোচনাটা হচ্ছে সংস্কার পরিষদের ওপর। এর সভা আহ্বানের ওপর। যদি এ রকম একটি প্রস্তাব দেওয়া হতো, সংস্কার নিয়ে আলোচনা হলো—এটাকে একটি বিশেষ জায়গায় পৌঁছানোর জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে, তাহলে সেটা বিবেচনার বিষয় হতে পারত।

‘সরকারি দলকে আন্তরিকভাবে আহ্বান জানাব, জনগণ গণভোটকে গ্রহণ করে নিয়েছে। আমরাও গ্রহণ করার মাধ্যমে যদি জনগণকে সম্মান করি, তাহলে এই সংসদ সম্মানিত হবে। জনঅভিপ্রায় এর মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হোক। আমাদের সমন্বিত উদ্যোগে। আমরা এক লাইনে, সরকারি দল আরেক লাইনে চলতেই থাকলাম; এর মাধ্যমে সমাধান কীভাবে হবে—তা আমরা সবাই বুঝি’—বলছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা।

স্পিকারের উদ্দেশে বিরোধীদলীয় নেতা বলেছেন, ‘আমরা সমাধান চাই। ন্যায্যতার ভিত্তিতে চাই। এ বিষয়ের ওপর আলোচনা হয়েছে, তার ওপর যদি আপনি উত্তম মনে করেন, তাহলে একটি কমিটি গঠন করতে পারেন। তবে সেখানে আমাদের আহ্বান থাকবে দুই দিক থেকে সমানসংখ্যক সদস্য নিয়ে যেন কমিটি গঠন করা হয়।’

এনসিপি বলছে, গণভোটের রায় যেকোন মূল্যে বাস্তবায়ন করতে হবে। কোনো ধরনের কমিটি নয়, সংবিধান সংস্কার পরিষদই গঠন করতে হবে। সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে একটি সর্বদলীয় বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের পক্ষে সায় দেওয়ায় জামায়াতের প্রতি ক্ষোভও দেখিয়েছেন কেউ কেউ।

গতকাল সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও এনসিপির মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, ‘৬৮ শতাংশ (গণভোটে ‘হ্যাঁ’–এর পক্ষে) সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন এই সংবিধানের মৌলিক কোন জায়গায় পরিবর্তন আনতে হবে। ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রতিটি দলের রক্ত শ্রম ও ঘামের মধ্য দিয়ে হাসিনার পতন হয়েছে। গণরায় কখনো কেতাবের কাছে মাথা নত করে না। এটা ভ্যাটিক্যান সিটি নয় যে গসপেল অনুযায়ী পরিচালিত হবে। ৬৮ শতাংশ সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন এই সংবিধানের মৌলিক কোন জায়গায় পরিবর্তন আনতে হবে।’

‘সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সংবিধান সংস্কার পরিষদের পরিবর্তে তথাকথিত ‘সংবিধান সংশোধন কমিটি’তে একমত পোষণ করেছেন, যা জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ও একদফা ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়’—মনে করেন এনসিপির সহযোগী সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান।

বিরোধীদলীয় নেতার এ সিদ্ধান্তকে দৃঢ়তাহীন উল্লেখ করে প্রত্যাখ্যান করেন—ছাত্রশক্তির এই নেতা।

জাহিদ আহসান বলছিলেন, আপসের মাধ্যমে কখনোই প্রকৃত সংস্কার বাস্তবায়িত হয়নি এবং হবে না ভবিষ্যতেও।

‘বিরোধীদল শুধু সংশোধন কমিটিকে মেনে নিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং সেখানে ৫০-৫০ অংশীদারিত্বও চেয়েছে। সরকারের সঙ্গে আপস করে এই ধরনের ‘সাংবিধানিক দান-খয়রাত’ গ্রহণের মাধ্যমে শহীদদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়’—উল্লেখ করেন জাহিদ আহসান।

‘প্রস্তাবিত সংশোধন কমিটি কিছু সাধারণ সংশোধনী আনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, এতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। ‘আমাদের প্রয়োজন মৌলিক ও বিপ্লবী পরিবর্তন। সংবিধান সংস্কার পরিষদই একমাত্র সমাধান, সংশোধন কমিটির নামে কোনো আপস চলবে না’, যোগ করেন ছাত্রশক্তির শীর্ষ এই নেতা।

একই সুরে কথা বলেন এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব সালেহ উদ্দিন সিফাত। তার ভাষ্য, সংবিধানের সংশোধনের জন্য আলাদা কোনো কমিটির প্রয়োজন নেই। সাধারণ সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তা সম্ভব। সংবিধানের ‘সংস্কার’ যার মাধ্যমে মৌলিক কাঠামো পরিবর্তিত হয় তার জন্য গণপরিষদ বা অন্তত সংবিধান সংস্কার পরিষদের মতো একটি গঠনতান্ত্রিক কাঠামো অপরিহার্য।

‘জনগণ শুধুমাত্র সংশোধনী চায়নি, বরং প্রকৃত সংস্কার চেয়েছে। ইতোমধ্যে সংবিধানে ১৭ বার সংশোধনী আনা হলেও তাতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি’—যোগ করেন সালেহ উদ্দিন সিফাত।

সরকারকে সতর্ক করেন এনসিপির এই নেতা বলছিলেন, ‘গণভোটের মাধ্যমেই জনগণ সংবিধান সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে। জনগণের সঙ্গে প্রতারণার ফল কখনোই ভালো হয় না’

তবে জামায়াতের কয়েকজন সংসদ সদস্য গণভোট ও সংস্কার পরিষদের পক্ষেই জোরালো যুক্তিতর্ক তুলে ধরেন।

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা নিয়ে মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় জামায়াতের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বলেছেন, সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির এই আদেশ আইন। এটি জারির এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির আছে। গণ-অভ্যুত্থান এ এখতিয়ার দিয়েছে। কোনো আইন অবৈধ কিনা, সেটা বলার এখতিয়ার আছে হাইকোর্টের। অন্য কেউ কোনো আইনকে অবৈধ বলতে পারেন না।

‘জুলাই সনদে যেসব প্রস্তাব আছে, সেগুলো সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যাবে না। এ জন্য দরকার হবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ।’

জুলাই সনদ না আইন, না অধ্যাদেশ—এ বিষয়ে নাজিবুর বলছিলেন, এ আদেশের বৈধতা নিয়ে আদালতে রিট আমলে নিয়ে রুল হয়েছে। এটা আইন না হলে চ্যালেঞ্জ করে রিট হওয়ার কথা নয়।

‘জনগণের আবেগ হলো সংবিধানের বাবা’—যোগ করেন ব্যারিস্টার নজিবুর।

জামায়াতের রফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, ১৯৭৭ সালে, এরশাদের আমলে ও ১৯৯১ সালে গণভোট হয়েছে। এর কোনোটাই সংবিধানে ছিল না, কিন্তু গণভোটের রায় কার্যকর হয়েছে। এবার ৭০ শতাংশ মানুষ গণভোটে পক্ষে রায় দিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন রাখেন, ৭০ শতাংশ শক্তিশালী নাকি ৫১ শতাংশ (বিএনপি জোটের প্রাপ্ত ভোটের হার)।

    শেয়ার করুন: