মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তারেক রহমানের মতবিনিময়
স্বচ্ছতা নিশ্চিতে দলের কাছে মন্ত্রীদের জবাবদিহি
- তৃণমূলের সঙ্গে সমন্বয়ে কাজ করবেন এমপিরা
- নিয়ম মেনে ঠিকাদারি কাজ পাবেন দলীয় নেতাকর্মী
- শিগগিরই সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হবে দল
- সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিতে তিন মাস পর সাংগঠনিক সভা

সংগৃহীত ছবি
বিএনপি মনে করছে, সংগঠন তথা দলই আসল। তাই দলের কাছে সরকারের মন্ত্রীদের জবাবদিহির আওতায় আনলো বিএনপি। একই সঙ্গে তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে দলের এমপিদেরও দেওয়া হয়েছে নির্দেশনা। মূলত দল এবং জনগণের কাছে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নেওয়া হয়েছে এমন উদ্যোগ।
গতকাল শনিবার (৯ মে) দিনব্যাপী রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে দল এবং তিন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের তৃণমূলের সঙ্গে বিএনপির চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মতবিনিময় সভায় নেওয়া হয় এসব সিদ্ধান্ত।
সরকারের গৃহীত নানা পদক্ষেপ জনগণের কাছে তুলে ধরা এবং সরকারের কোনো ভুলত্রুটি হলে তা সংশোধনে প্রতি তিন মাস পর বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করার বিষয়েও নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এ সভায়।
সভায় উপস্থিত একাধিক নেতা এ তথ্য জানিয়ে বলেছেন, এসব মতবিনিময়ে নিজেদের ভুলভ্রান্তি নিয়ে করা হবে আলোচনা। সেই আলোকে তা সমাধানের পথ খুঁজে বের করবে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার।
মতবিনিময় সভা শেষে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির গণমাধ্যমকে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর আজ (শনিবার) প্রথমবারে মতো বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে জেলা ও মহানগরের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন তারেক রহমান। মূলত তিন মাসে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার, তা জানানো হয়েছে নেতা-কর্মীদের, যেন সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের অবস্থান তুলে ধরতে পারেন তারা। একই সঙ্গে কী কী পদক্ষেপ নিলে উপকৃত হতে পারে সাধারণ মানুষ, এমন পরামর্শও চাওয়া হয়েছে তৃণমূল নেতাদের কাছে।
‘সভায় বক্তব্য তুলে ধরেছেন মন্ত্রীরা। তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চেয়েছেন জেলাপর্যায়ের নেতাকর্মীরা। আশা করছি, এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যেমন সরকারের জবাবদিহি বাড়বে; একই সঙ্গে সরকারের যেসব ভুলত্রুটি হচ্ছে, সেগুলো সংশোধনের মধ্য দিয়ে আরও ভালোভাবে এগিয়ে যাবে দেশ।’
জনগণের চাওয়া-পাওয়া নিয়েও সচেতন থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তৃণমূল নেতাদের। এজন্য প্রত্যেক এলাকার তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করে কর্মসূচি নির্ধারণ করতে হবে দলীয় এমপিদের। সরকারের উন্নয়নমূলক কাজ কিংবা ইশতেহার বাস্তবায়নের তথ্য তুলে ধরে করতে হবে লিফলেট বিতরণ। এসব কর্মসূচি থানা-উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে ঠিক করে কেন্দ্রীয় কার্যালয়কে অবহিত করার জন্যও বলা হয়েছে সভায়।
জানা গেছে, সভায় সরকারের ৮০ দিনের কার্যক্রম তুলে ধরা হয়। মন্ত্রীরা নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ে তাদের উন্নয়ন কার্যক্রম, অবকাঠামো এবং কাজের বিষয়ে জানিয়েছেন তৃণমূল নেতাদের। যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল এবং ছাত্রদলের ছয়জন করে নেতা প্রশ্ন করেছেন মন্ত্রীদের। নিজ এলাকার অবস্থা তুলে ধরে তা উন্নয়নের জন্য পরামর্শও দিয়েছেন অনেকে।
এই মতবিনিময় সভাটি মূলত জাতীয় সংসদের আদলে করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তৃণমূল নেতারা। এখানে মন্ত্রীরা তুলে ধরেছেন তাদের কাজের বিবরণ ও পরিকল্পনা। সারাদেশ থেকে আগত নেতারা তাদের কাছ থেকে এসব বিষয় জানতে চেয়েছেন বিস্তারিত। দল ও কর্মীদের কাছে এক ধরনের কৈফিয়তের মতো এটি। যেটা দলের কাছে নিশ্চিত করে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির আলোকে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে মনোযোগী হয়েছে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার। এর অংশ হিসেবে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে প্রতিশ্রুত ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণ, সুদসহ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ এবং খাল খননের মতো কর্মসূচি। যেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থান নিয়েছে সরকার।
বিএনপি এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের তৃণমূল নেতাদের ভাষ্য, প্রতি তিন মাস পরপর এই সভা অনুষ্ঠিত করা গেলে জবাবদিহি থাকবে মন্ত্রীদের কার্যক্রমে কোনো অনিয়ম থাকলে সামনেই আলোচনা হবে সেইটা।
সভায় আরও বলা হয়েছে, চব্বিশের ৫ আগস্ট পরবর্তী এমনকি বিএনপি সরকার গঠনের পরও দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে কাজ করছিল অনিশ্চয়তা কিংবা হতাশা। তা নিরসনে নানান পদক্ষেপের অংশ হিসেবে এই সাংগঠনিক সভাকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছে বিএনপি।
সভায় উপস্থিত একাধিক নেতার দাবি, সরকার গঠনের আগ থেকেই দলের মধ্যে ‘চেইন অব কমান্ড’ করা হয়েছে জোরালোভাবে। দলীয় এমন কঠোর অবস্থানের কারণে সরকারের কোনো সুযোগ-সুবিধা নিতে পারেননি তারা। এমনকি বিগত দিনের সরকারের মতো কোনো টেন্ডার-বাণিজ্য কিংবা অন্য কোনো প্রক্রিয়াতেও দলের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত করা হয়নি। এতে বিগত ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরাজ করছিল চরম হতাশা। এর পরিপ্রেক্ষিতে দলের শীর্ষ নেতাদের তরফ থেকে বলা হয়েছে— নিয়ম মেনে কাজ করলে পাওয়া যাবে সুবিধা। তবে এ সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রেও নানা প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরেছেন তৃণমূল নেতারা।
নেতাকর্মীদের আশ্বস্ত করে বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে বলা হয়— টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নিরসন করা হবে বিদ্যমান জটিলতা। প্রত্যেক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান যাতে সেখানে অংশগ্রহণ করতে পারে, নিশ্চিত করা হবে তা। তবে সেখানে কোনো প্রকার লুটপাট, অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। সভায় দলের শীর্ষ নেতাদের তরফ থেকে দেওয়া হয়েছে এমন কড়া বার্তাও। কারণ, ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এমন কোনো কর্মকাণ্ড মেনে নেবে না সরকার।
এ প্রসঙ্গে উপস্থিত তৃণমূল নেতাদের উদ্দেশে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, আগের সরকার যেভাবে লুটপাট করেছে, কাজ না করে টাকা উত্তোলন করেছে, পাচার করেছে— এমন কোনো কাজ করতে দেওয়া হবে না। শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির আলোকে এবং নিয়ম মেনে কাজ করতে হবে।
বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতারা বিশেষ করে সাংগঠনিক দায়িত্বে থাকা নেতারা সরকারের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিমত তৃণমূল নেতাদের। তা ছাড়া, গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষ না পেয়ে অর্ধ-শতাধিক আসনে দলের নেতারা বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় সেসব এলাকায় তৃণমূল কার্যত রয়েছে বিভক্ত অবস্থায়। তাই তৃণমূলে সংগঠনকে আরও গতিশীল করতে খুব শিগগিরই সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের দিকে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি।
এ সভায় বক্তব্য দেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমসহ অনেকে।
সভায় অংশ নেওয়া ঢাকা মহানগর বিএনপির এক নেতা বলেছেন, ‘এখানে সরকারের ১০ জন মন্ত্রী তাদের ৮০ দিনের কার্যকলাপ তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাদের দ্বিধা আছে। যেমন গণভোট, জুলাই সনদ, হামে শিশুদের মৃত্যু নিয়ে সরকারের ব্যাখ্যা চাওয়ার পাশাপাশি নেতা-কর্মীদের রাজনৈতিক মামলাগুলো প্রত্যাহারের বিষয়ে সরকার কী ভাবছে— তা জানতে চান। সভায় এই বিষয়গুলোর পরিষ্কার ব্যাখা দিয়েছেন মন্ত্রীরা।
গণভোট নিয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করে বলা হয়— রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, তার প্রতিটি বিষয় আক্ষরে অক্ষরে বিএনপি বাস্তবায়ন করবে। এর মধ্যে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষে সংসদের আসন অনুপাতে প্রতিনিধি নির্বাচিত হবে। এ ছাড়া উচ্চকক্ষে সংবিধান সংশোধনসহ কয়েকটি বিল পাঠানো হবে না।
বিগত সময়ের মামলার বিষয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, যেগুলো ট্রায়ালে চলে গেছে, সেগুলো আদালতে সমাধান হবে।
সভায় হামের বিষয়টি তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। বিগত সময়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কীভাবে ভেঙে পড়েছিল, সেটার ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে কীভাবে এটা পুনরুদ্ধার করছেন, তা-ও আলোচনা করেছেন।
সভার আলোচ্য প্রসঙ্গে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, দলের নির্বাচনী ইশতেহার এবং জনকল্যাণে সরকারের যেসব পরিকল্পনা রয়েছে, সেগুলো তুলে ধরা হয়েছে নেতাদের কাছে।
এ দিন বেলা পৌনে ১১টায় সভায় প্রবেশ করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সভার শুরুতে বিএনপি চেয়ারম্যান ছাড়াও স্বাগত বক্তব্য দেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাত ৮টার দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এ সভা।
রিজভীর সভাপতিত্বে এবং বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্সের সঞ্চালনায় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমানসহ অনেকে।




