গণভোটের রায় উপেক্ষা করলে জনগণ মেনে নেবে না : শফিকুর রহমান

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। ছবি : আগামীর সময়
জুলাই জাতীয় সনদের সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে গণভোটের রায় উপেক্ষা করা হলে জনগণ তা মেনে নেবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে মত দিয়েছেন। এই রায় অগ্রাহ্য করে সংস্কারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হলে জনগণ তা মেনে নেবে না।
আজ রবিবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেছেন বিরোধীদলীয় নেতা।
ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে সাত মাসের বেশি সময় ধরে আলোচনা হয়েছে। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। দীর্ঘ আলোচনার মধ্য দিয়ে অধিকাংশ বিষয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে জাতীয় সনদ তৈরি হয়। সেই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার থেকেই সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এতে স্বাক্ষর করেছিল।
কিন্তু এখন গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা অজুহাত সামনে আনা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জামায়াত আমির বলেন, তার দল চেয়েছিল, আগে গণভোটের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন হোক। এরপর জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। কিন্তু একই দিনে গণভোট ও সংসদ নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্তে দুটি বিষয় একাকার হয়ে গেছে। এতে গণভোটে জনগণের মতামত ও সংস্কারের প্রশ্ন যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না।
তিনি অভিযোগ করেন, যেসব ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন, সেসব ক্ষেত্রেও বিএনপি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে। জাতির কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে সরকারে যাওয়ার পর অবস্থান পরিবর্তন করা গ্রহণযোগ্য নয়। নোট অব ডিসেন্ট নিয়ে সমঝোতার নামে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করতে জামায়াত রাজি নয়।
সংশোধনের নামে এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া উচিত হবে না, যা পরে আইনি জটিলতায় পড়ে বাতিল হয়ে যায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংবিধান সংশোধনের প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেছেন, অতীতে সংবিধান মেনেই সভা-সমাবেশ, মিছিল ও আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু তাতে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটেনি। তাই এখন সংবিধানের দোহাই দিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার আটকে রাখার চেষ্টা কেন করা হচ্ছে, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
জনগণের সঙ্গে করা অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের পথ বের করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
আলোচনা সভায় বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের ভোট চাওয়া এবং দলটির নেতাকর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পুনর্বাসনের অভিযোগ তোলেন জামায়াত আমির।
তিনি বলেছেন, একদিকে জামায়াতকে পরিত্যক্ত ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে হাত মেলানোর অভিযোগে জড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপি নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের ভোট চেয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী বিএনপি ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় স্থান পাচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সরকারের সামগ্রিক কার্যক্রমের সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মানুষ বৈষম্যহীন, মানবিক ও ন্যায়বিচারভিত্তিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিল। তরুণেরা সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য জীবন দিয়েছেন।
কিন্তু জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার অভিযোগ, বৈষম্য ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তে ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার রাজনীতি প্রয়োজন।
চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তাঁর ভাষ্য, চাঁদাবাজির কারণে সাধারণ মানুষকে বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। অথচ কৃষকেরা উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না।
পঞ্চগড়ে চারটি লাউ এক টাকায় বিক্রির খবর উল্লেখ করে তিনি বলেন, কৃষকেরা পণ্যের ন্যায্য দাম না পেলেও রাজধানীর ভোক্তাদের সেই পণ্য কিনতে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। কৃষক ও ভোক্তার মধ্যকার এই মূল্যবৈষম্য দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
চাঁদাবাজিতে অভিযুক্ত কোনো জনপ্রতিনিধির পদত্যাগই অপরাধের দায় শেষ করার জন্য যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেছেন শফিকুর রহমান। তার মতে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
রাগ মেডিকেল সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, অপরাধের বিচার নিশ্চিত না করে শুধু পদত্যাগের মাধ্যমে দায় এড়ানোর সুযোগ থাকা উচিত নয়।
সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অর্থ, অস্ত্র ও মাদক প্রবেশের অভিযোগ তুলে সরকারের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। এসব অবৈধ তৎপরতা প্রতিরোধ করা সরকারের দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেন জামায়াত আমির। মাদক নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে শফিকুর রহমান বলেছেন, সংশোধনের নামে জনগণকে বিভ্রান্ত করার পথ পরিহার করে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে সরে দাঁড়ানো উচিত। সরকারের ব্যর্থতার দায় বিরোধী দলের ওপর চাপিয়ে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরানোর চেষ্টা না করে সমস্যার সমাধানে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
শফিকুর রহমান বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী কিংবা ১১ দলীয় ঐক্য কোনো দলীয় স্বার্থে আন্দোলন করছে না। তাদের কর্মসূচি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। এই আন্দোলন নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ।
আন্দোলনকারীদের ওপর কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা চাপিয়ে না দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি। জনগণের অধিকার আদায়ে প্রয়োজনে জীবন দিতেও তাঁরা প্রস্তুত বলে মন্তব্য করেন জামায়াত আমির।
আগামী লংমার্চ কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি জানান, ঢাকা থেকে খুলনা হয়ে কুষ্টিয়ায় গিয়ে কর্মসূচি শেষ হবে। এ কর্মসূচি ঘিরে কোনো ধরনের বাধা বা ষড়যন্ত্র না করার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, অতীতেও নানা বাধা মোকাবিলা করে আন্দোলনের নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে। এবারও কোনো ষড়যন্ত্রের কাছে মাথানত করা হবে না।
আলোচনা সভায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, গণভোটের মধ্য দিয়ে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট খারিজ হয়ে গেছে। সংস্কার পরিষদ ছাড়া সংবিধান পরিবর্তনের উদ্যোগ বেআইনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিশেষ কমিটির নামে জুলাই জাতীয় সনদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিষয় যুক্ত করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেন গোলাম পরওয়ার। এ ধরনের উদ্যোগ থেকে সরে আসতে বিএনপির প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সভায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম, জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, এবি পার্টির সদস্যসচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সাংবাদিক, আইনজীবী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বক্তব্য দেন।



