‘সংশোধন’ না ‘সংস্কার’
সংবিধান নিয়ে মুখোমুখি সরকার-বিরোধী দল
- জনগণের অভিপ্রায়কে উপেক্ষা করা উচিত হবে না : জামায়াত আমির
- বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোতেই পরিবর্তন আনতে হবে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগকে ঘিরে জাতীয় সংসদে শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক টানাপড়েন। সরকার সংবিধান সংশোধনের জন্য ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু শুরু থেকেই এই উদ্যোগের বিরোধিতা করে আসা বিরোধী জোট সংসদীয় কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করে অধিবেশন কক্ষ থেকে ওয়াকআউট করেছে। তাদের ঘোষণা, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে এখন থেকে সংসদের পাশাপাশি বাইরেও রাজনৈতিক কর্মসূচি চলবে।
গত সোমবার জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে এই বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। মূলত ১৭ সদস্যের কমিটি করার পরিকল্পনা ছিল। বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি আসন সংরক্ষিত রাখা হলেও তারা কোনো সদস্যের নাম না দেওয়ায় আপাতত ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। পরে কণ্ঠভোটে প্রস্তাবটি পাস হলে বিরোধী জোটের সংসদ সদস্যরা ওয়াকআউট করেন।
সংসদ নেতা তারেক রহমানের পক্ষে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি জানিয়েছেন, বিরোধী দলের সঙ্গে কয়েক দফা যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো সদস্যের নাম দেয়নি। তবে ভবিষ্যতে তারা চাইলে পাঁচটি শূন্য পদে সদস্য অন্তর্ভুক্ত করে কমিটি পুনর্গঠন করা হবে।
কিন্তু বিরোধী জোটের অবস্থান ছিল স্পষ্ট। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকেই তারা সংসদীয় কমিটির বিরোধিতা করে আসছে। তাদের দাবি, গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত গণভোটে দেশের মানুষ শুধু সংবিধানের কয়েকটি ধারা পরিবর্তনের পক্ষে মত দেয়নি; বরং একটি নতুন সাংবিধানিক কাঠামো প্রণয়নের জন্য স্বাধীন ও স্বতন্ত্র সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের পক্ষে রায় দিয়েছে।
বিরোধী নেতাদের ভাষায়, ‘সংশোধন’ ও ‘সংস্কার’ এক বিষয় নয়। সংশোধন মানে বিদ্যমান সংবিধানের কিছু ধারা পরিবর্তন, আর সংস্কার মানে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নতুনভাবে গড়ে তোলা। তাই সংসদের অধীনে গঠিত বিশেষ কমিটির মাধ্যমে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
সংসদে এ অবস্থান তুলে ধরেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, বিরোধী জোট কখনোই এই কমিটিতে সদস্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়নি। তারা জনগণের কাছে দেওয়া অঙ্গীকার অনুযায়ী গণভোটের রায় বাস্তবায়নে অটল রয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমানের ভাষায়, বিরোধী জোট জনগণের কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ। গণভোটের রায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তারা সংসদ সদস্য হিসেবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দুটি শপথ নিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদকে পাশ কাটিয়ে যদি এই কমিটি গঠন করা হয়, তাহলে আমরা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছি। আমরা আমাদের আগের অবস্থানেই আছি।’
তার মতে, জনগণের অভিপ্রায়কে উপেক্ষা করা উচিত হবে না। জনগণের রায়কে সম্মান না জানানোয় প্রতিবাদ হিসেবে বিরোধী জোট শুধু কমিটিতে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি, বরং সংসদ থেকেও ওয়াকআউট করছে।
পরে সংসদ ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেও তিনি একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। ডা. শফিকুর রহমানের দাবি, জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ ছিল। দুটি পৃথক ব্যালটে জনগণ তাদের মতামত দিয়েছে। তাই একটি ফলাফল গ্রহণ করে অন্যটি উপেক্ষা করা যায় না।
তবে সরকারের অবস্থান ভিন্ন। বিরোধী জোটের ওয়াকআউটের পর সংসদে বক্তব্য দেন বিশেষ কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, বর্তমান সংবিধানের ভিত্তিতেই নির্বাচন হয়েছে, সংসদ গঠিত হয়েছে এবং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কার্যক্রম চলছে। ফলে সেই সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার মধ্যেই প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে।
বিরোধী দলের দ্বিতীয় শপথের দাবিরও আইনগত ভিত্তি নেই বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করলেন, বর্তমান সংবিধানে সংসদ সদস্যদের বাইরে পৃথক কোনো সংবিধান সংস্কার পরিষদের স্বীকৃতি নেই। আগে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বিধান যুক্ত করতে হবে। পরে রাজনৈতিক ঐকমত্য হলে সেই অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
এদিকে সংসদের ভেতরের বিরোধ এখন রাজনীতির মাঠেও ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেছেন, গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের দাবি থেকে তারা একচুলও সরে আসবেন না। সংসদে আপত্তি উপেক্ষা করে কমিটি গঠন করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, এ দাবিতে সংসদের ভেতরে যেমন আন্দোলন চলবে, তেমনি রাজপথেও রাজনৈতিক কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
তিনি আরও বলেছেন, বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিক, যারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন, তারা এখন সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের অপেক্ষায় আছেন। জনগণের রায় বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রসংস্কার সম্পন্ন করতে হবে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে গত ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট। ওই গণভোটে ভোটারদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, বিদ্যমান সংবিধানের পরিবর্তে নতুন সাংবিধানিক কাঠামো প্রণয়নের লক্ষ্যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করা হবে কি না। সংসদ সদস্য নির্বাচনের পাশাপাশি পৃথক ব্যালটে ভোটাররা এ বিষয়ে মতামত দেন।
বিরোধী জোটের দাবি, জনগণের সেই রায় তাদের ওপর রাজনৈতিক ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছে। তাই তারা সংসদীয় সংশোধন কমিটির পরিবর্তে স্বাধীন সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিতে অনড়।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে কাজ করা বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, এই বিরোধ ভবিষ্যতে নতুন রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিতে পারে। ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রশ্নে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টি করে বিভক্তি বাড়ানো হচ্ছে। তার মতে, সরকার গঠনের শুরুতেই এমন অনৈক্য ভবিষ্যতে রাজনৈতিক জটিলতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নিয়ে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করে কার লাভ হচ্ছে?




