কমিটিতে ‘মাইম্যান’ বসাতে টানাটানি, থমকে গেছে বিএনপির পুনর্গঠন
- বিএনপির ১১ অঙ্গসংগঠনের ১০টির কমিটিই মেয়াদোত্তীর্ণ
- নিজের লোক বসানোর সিন্ডিকেটে সাবেক ছাত্রনেতারা
- হাইকমান্ড বাধ্য হয়ে সহযোগিতা নিচ্ছে গোয়েন্দা সংস্থার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কমিটিতে ‘মাইম্যান’ ঢোকানোর চেষ্টায় থমকে গেছে বিএনপির পুনর্গঠন। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও জাতীয় কাউন্সিল সামনে রেখে দল ও অঙ্গসংগঠনগুলো ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। কিন্তু দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সিন্ডিকেট ও বলয়ের নেতাদের নিজের অনুসারীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর তৎপরতায় আটকে গেছে নতুন নেতৃত্ব ঘোষণার প্রক্রিয়া।
এরই মধ্যে গত ৪ জুন জাতীয়তাবাদী যুবদলের আংশিক কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হয়েছে। ৪ জুলাই স্বেচ্ছাসেবক দল এবং ১৩ আগস্ট ছাত্রদলের শীর্ষ নেতাদের আনুষ্ঠানিক বিদায়ও জানানো হয়েছে। কিন্তু এরপরও সংগঠন দুটির নতুন কমিটি ঘোষণা হয়নি। নেতৃত্ব বাছাইয়ে সিন্ডিকেটের প্রভাব, সিনিয়র-জুনিয়র সমন্বয় এবং যোগ্যতা বিবেচনা নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা।
দলীয় সূত্রের খবর, গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসংগঠনগুলোর শীর্ষ পদে ‘নিজেদের লোক’ বসিয়ে আধিপত্য ধরে রাখতে চাইছে একাধিক বলয়। সাবেক ছাত্রনেতাদের সমন্বয়ে গঠিত এসব সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে কমিটি গঠনে প্রভাব বিস্তার করে আসছে। অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোও ভাগাভাগি করে নেয় তারা। এবারও সেই পুরনো প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা চলছে।
তবে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতায় সিন্ডিকেটের প্রভাবমুক্ত কমিটি চান বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে তিনি নিজস্ব ব্যবস্থায় খোঁজখবর নিচ্ছেন। এ কাজে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতাও নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতামত নেওয়া হলেও জনআকাঙ্ক্ষা বিবেচনায় নিয়েই নতুন নেতৃত্ব বাছাই করতে চান তিনি।
তৃণমূলের প্রত্যাশা, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর কমিটি হবে সিন্ডিকেটমুক্ত। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যাদের ভূমিকা ছিল, যাদের মেধা ও সাংগঠনিক সক্ষমতা রয়েছে, কোনো অপকর্মে জড়িত নন এবং সারা দেশের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে— এমন নেতাদেরই সামনে আনা হবে।
বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকায় সরকার ও দলকে আলাদা রাখতে চান তারেক রহমান। দল সরকারে মিশে যাক, কোনোভাবেই তা চান না তিনি। সম্প্রতি জেলার নেতাদের সঙ্গে সাংগঠনিক বৈঠকগুলোতেও তিনি বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন।
১১ সংগঠনের ১০টির কমিটিই মেয়াদোত্তীর্ণ: বিএনপির ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন হলো— জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল, কৃষক দল, ছাত্রদল, তাঁতী দল, মৎস্যজীবী দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, শ্রমিক দল, জাসাস ও ওলামা দল। এর মধ্যে ছাত্রদল ও শ্রমিক দল সহযোগী সংগঠন। যুবদল ছাড়া বাকি ১০টির কমিটিই মেয়াদোত্তীর্ণ।
দলীয় গঠনতন্ত্রে প্রতি তিন বছর অন্তর নতুন কমিটি গঠনের বিধান থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে তা বাস্তবায়িত হয়নি। কোনো সংগঠন চলছে পাঁচ বছর, কোনোটি সাত বছর, আবার কোনোটি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে পুরনো কমিটি দিয়ে। কোথাও আবার কমিটিই নেই প্রায় দুই বছর। এতে সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। নতুন নেতৃত্ব তৈরির পথও সংকুচিত হচ্ছে।
যুবদল ছাড়া স্থবির ১০ সংগঠন
স্বেচ্ছাসেবক দল: তিন বছর মেয়াদি স্বেচ্ছাসেবক দলের বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয় ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। গত ৪ জুলাই তারেক রহমান শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে আনুষ্ঠানিক বিদায় জানান এবং শিগগির নতুন কমিটি দেওয়ার কথা বলেন। কিন্তু দুই মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কমিটি হয়নি। সভাপতি এস এম জিলানী গোপালগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য। সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসান বরিশাল-৪ আসনের সংসদ সদস্য হওয়ার পাশাপাশি নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ দুই নেতা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকায় সংগঠনের কার্যক্রমেও আগের মতো সময় দিতে পারছেন না।
ছাত্রদল: রাকিব-নাছিরের নেতৃত্বাধীন ছাত্রদলের দুই বছর মেয়াদি কমিটির মেয়াদ শেষ হয় চলতি বছরের ১ মার্চ। গত ১৩ আগস্ট শীর্ষ নেতাদের আনুষ্ঠানিক বিদায় জানান তারেক রহমান। বৈঠকে পাঁচ শীর্ষ নেতার কাছে নতুন নেতৃত্বের নাম জানতে চাওয়া হলে তারা গোপন ব্যালটে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম দেন। এরপর বিদায়ের বার্তা এলেও এক মাসেও নতুন কমিটি হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তরুণ না অভিজ্ঞ— কাদের সমন্বয়ে কমিটি হবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত না হওয়ায় প্রক্রিয়া আটকে আছে। ছাত্রদলের কমিটি গঠনে দীর্ঘদিন প্রভাবশালী দুটি বলয় অনুসারী ‘সিনিয়র’ নেতাদের সামনে আনতে চায়। অন্যদিকে গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বিবেচনায় তুলনামূলক জুনিয়রদের দিয়ে কমিটি গঠনের পরামর্শও রয়েছে।
শীর্ষপদের আলোচনায় ২০০৮-০৯, ২০০৯-১০ ও ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের নেতারাও রয়েছেন। সিনিয়র-জুনিয়র সমন্বয় কিংবা আরও তারুণ্যনির্ভর কমিটি— দুই ধরনের প্রস্তাবই বিবেচনায় রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেকোনো সময় ছাত্রদলের নতুন আংশিক কমিটি ঘোষণা হতে পারে।
মহিলা দল: ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর আফরোজা আব্বাসকে সভাপতি ও সুলতানা আহমেদকে সাধারণ সম্পাদক করে পাঁচ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। ২০১৯ সালের ৪ এপ্রিল ২৬৫ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন পায়। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর পরপর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও প্রায় ১০ বছর ধরে একই কমিটি চলছে। এর মধ্যে আফরোজা আব্বাস জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান এবং সুলতানা আহমেদ সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হয়েছেন।
মৎস্যজীবী দল: প্রায় দুই বছর ধরে কেন্দ্রীয় কমিটিবিহীন জাতীয়তাবাদী মৎস্যজীবী দল। ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সংগঠনটির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। এর আগে ২০১৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রফিকুল ইসলাম মাহতাবকে আহ্বায়ক ও আব্দুর রহিমকে সদস্য সচিব করে ১৫৪ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় কমিটি না থাকায় সারা দেশে সংগঠনটির কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
তাঁতী দল: ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল আবুল কালাম আজাদকে আহ্বায়ক ও মজিবুর রহমানকে সদস্য সচিব করে ১২৮ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। তিন মাসের জন্য গঠিত সেই কমিটি প্রায় সাত বছর ধরে বহাল রয়েছে।
শ্রমিক দল: জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল হয় ২০১৪ সালের এপ্রিলে। এতে আনোয়ার হোসাইন সভাপতি ও নূরুল ইসলাম খান নাসিম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। দুই বছর মেয়াদি কমিটির মেয়াদ শেষ হয় ২০১৬ সালের এপ্রিলে। কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও এরপর আর কাউন্সিল হয়নি।
কৃষক দল: ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে গঠিত কৃষক দলের তিন বছর মেয়াদি কমিটির মেয়াদ শেষ হয় ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে। সভাপতি হাসান জাফির তুহিন সম্প্রতি সচিব পদমর্যাদায় বিএমডিএর চেয়ারম্যান হয়েছেন। সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বাবুল সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে দুই বছর ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়েই চলছে সংগঠনটি।
জাসাস: চিত্রনায়ক হেলাল খানকে আহ্বায়ক ও জাকির হোসেন রোকনকে সদস্য সচিব করে ২০২১ সালের ৬ নভেম্বর জাসাসের ৭১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটি প্রায় পাঁচ বছর ধরে বহাল রয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধা দল: মুক্তিযোদ্ধা দলের সর্বশেষ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে। এতে ইশতিয়াক আজিজ উলফাত সভাপতি ও সাদেক খান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিন বছর পরপর নতুন কমিটি হওয়ার কথা থাকলেও এক যুগের বেশি সময় ধরে একই কমিটি চলছে।
ওলামা দল: ২০২৪ সালের ২৬ এপ্রিল মাওলানা মো. সেলিম রেজাকে আহ্বায়ক ও মাওলানা কাজী মোহাম্মদ আবুল হোসেনকে সদস্য সচিব করে পাঁচ সদস্যের আংশিক আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। একই বছরের ২ জুলাই ১৩৭ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন পায়। তিন মাসের জন্য গঠিত আহ্বায়ক কমিটি এখন ২৯ মাস ধরে দায়িত্ব পালন করছে।
জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আগামীর সময়কে বললেন, ‘দল ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কমিটি গঠন-পুনর্গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। এজন্য চেয়ারম্যান তারেক রহমান দায়িত্বশীল নেতাদের নিয়ে কাজ করছেন। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে অঙ্গসংগঠনগুলোর পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হবে।’



