নাহিদ ইসলাম
পতিত ও নব্য স্বৈরাচার—কোনোটিকেই ছাড় দেওয়া হবে না

শুক্রবার রাজধানীর শাহবাগে চার দফা আদায়ের লক্ষ্যে আয়োজিত গণবিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দেন নাহিদ ইসলাম
গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একটি স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটলেও দেশে আবারও নতুন করে স্বৈরাচারী প্রবণতার উত্থান হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেছেন, ‘অতীতের স্বৈরাচার এবং নব্য স্বৈরাচার—কোনোটিকেই ছাড় দেওয়া হবে না। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে উভয় শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।’
আজ শুক্রবার বিকালে রাজধানীর শাহবাগে চার দফা আদায়ের লক্ষ্যে আয়োজিত গণবিক্ষোভ সমাবেশে বক্তৃতাকালে এসব কথা বলেছেন তিনি।
সমাবেশে নাহিদ ইসলাম বলছিলেন, ‘হাজারো মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশে গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল। সেই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরং দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন করে স্বৈরাচারী শাসনের লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে।’
দেশের চলমান পরিস্থিতি তুলে ধরে এনসিপির আহ্বায়ক বললেন, ‘সাধারণ মানুষ নানা সংকটে দিন কাটাচ্ছে। বাসাবাড়িতে গ্যাসের সংকট, বিদ্যুতের সমস্যা, নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে জনজীবন বিপর্যস্ত। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের শিকার হচ্ছেন। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও দলীয়করণের পথে এগোচ্ছে।’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের পদত্যাগ দাবি করেন নাহিদ ইসলাম। তার অভিযোগ, দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংবিধান সংশোধনের কাজে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরও পদত্যাগ দাবি করেন তিনি।
জুলাই সনদ ও গণভোটের প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘গণভোটে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমর্থনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা উপেক্ষা করা হচ্ছে। জনগণের মতামতকে পাশ কাটিয়ে একতরফাভাবে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়া গ্রহণযোগ্য নয়। অবিলম্বে একতরফা সংবিধান সংশোধন কমিটি বাতিল করে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে।’
বিএনপি সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলছিলেন, ‘ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দলটি জুলাই সনদ, ৩১ দফা এবং নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যাচ্ছে।’ তার অভিযোগ, রাষ্ট্র পরিচালনায় সুস্পষ্ট পরিকল্পনার পরিবর্তে দুর্নীতি, লুটপাট, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের কর্মকাণ্ডে জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটছে না বলে উল্লেখ করেন নাহিদ। বলেন, ‘আগামী ডিসেম্বরে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব দেশে ফেরার চেষ্টা করবে। কিন্তু বর্তমান সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক শক্তিকে মোকাবিলা করতে পারবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। অতীতে বিএনপি আওয়ামী লীগের শাসনামলে জনগণকে সুরক্ষা দিতে পারেনি। এ পরিস্থিতিতে তরুণসমাজ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের সব শক্তিকে আবারও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’
আঞ্চলিক রাজনীতির প্রসঙ্গ তুলে নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার বিভিন্ন অপতৎপরতা চলছে। সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা, পাহাড়ি অঞ্চলে অস্থিরতা এবং ভারতের বিভিন্ন স্থানে মুসলমানদের ওপর নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে। তার দাবি, বাংলাদেশের হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়কে ঘিরেও নানা ধরনের ষড়যন্ত্র চলছে। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় বর্তমান সরকার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
সীমান্ত হত্যার উদাহরণ হিসেবে স্বর্ণা দাস ও ফেলানি খাতুনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও সীমান্তে একাধিক বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। দেশের সার্বভৌমত্ব ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।’
ভারতের সঙ্গে করিডর এবং গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়েও বক্তব্য দেন নাহিদ ইসলাম। তার ভাষ্য, দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতকে করিডর দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জনগণের সম্মতি ছাড়া এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলে তা মেনে নেওয়া হবে না। পাশাপাশি গঙ্গা চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ন্যায্য পানির হিস্যা নিশ্চিত করতে হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে এ বিষয়ে ন্যায্য সমাধান না হলে জনগণকে নিয়ে আন্দোলন শুরু করবে এনসিপি।
সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন আরও বিস্তৃত করার ঘোষণা দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘খুন, গুম, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের দায় সরকারকে নিতে হবে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথের কর্মসূচি চলবে। প্রয়োজনে সারা দেশে আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়া হবে এবং তারেক রহমানকে ঘেরাও করে দাবি আদায়ের কর্মসূচি নেওয়া হবে।’
সমাবেশে ঢাকা মহানগরের রাজনীতিতে এনসিপির সাংগঠনিক অবস্থান তুলে ধরে তিনি জানান, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ঢাকা মহানগর দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং উত্তরে আসিফ মাহমুদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তাদের নেতৃত্বে নগরবাসীর নাগরিক অধিকার, সমস্যা ও দাবি নিয়ে মাঠে থাকবেন এনসিপির নেতাকর্মীরা।
অতীতে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে নির্বাচনে পরাজিত করা হয়েছিল বলে দাবি করে তিনি বলেন, ‘এবার তাকে বিজয়ী করতে দলের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন। একইভাবে আসিফ মাহমুদকে নির্বাচনের বাইরে রাখার যে প্রচেষ্টা হয়েছিল, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তারও জবাব দেওয়া হবে।’



