আগামীর সময়

স্থানীয় সরকার নির্বাচন

সক্ষমতা যাচাইয়ের সুযোগ হিসেবে দেখছে এনসিপি

  • একা পথে হাঁটার চিন্তা, আছে জোটের আলোচনাও
  • ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে এনসিপির প্রার্থী চূড়ান্ত
সক্ষমতা যাচাইয়ের সুযোগ হিসেবে দেখছে এনসিপি

এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব ও মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূইয়া

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে তোড়জোড় শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। সরকারের পক্ষ থেকেও ইতিবাচক বার্তা মিলেছে। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো এখন নিজেদের সাংগঠনিক প্রস্তুতি গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত সময় পার করছে।

এই প্রেক্ষাপটে তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) পিছিয়ে নেই। বরং একধাপ এগিয়েই মাঠ গোছানোর কাজ শুরু করেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তারিখ এখনো ঘোষণা না হলেও নির্বাচন পরিচালনার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে দলীয়ভাবে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে কার্যক্রম শুরু করেছে তারা। পাশাপাশি একাধিক প্রস্তুতি সভা আয়োজন এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকা তৈরির কাজও চলছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে জোটগত সমঝোতার পথে না গিয়ে এককভাবেই অংশ নেওয়ার চিন্তা করছে এনসিপি। নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা যাচাই এবং তৃণমূল পর্যায়ে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতেই এই সিদ্ধান্তের দিকে ঝুঁকছে দলটি। যদিও একইসঙ্গে জোটগত আলোচনাও চলবে বলে জানিয়েছেন এনসিপির নেতারা।

বিশেষ করে রাজধানীর রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে কৌশলগত পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে এনসিপি। ইতোমধ্যেই আলোচনায় থাকা সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় মাঠ গোছানো শুরু করেছেন।

এনসিপির নেতারা বলছেন, তৃণমূলের মতামত, সাংগঠনিক শক্তি ও জনসমর্থনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। তরুণ নেতৃত্ব, নতুন রাজনৈতিক বার্তা এবং অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির প্রতিশ্রুতি নিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দৃশ্যমান ও কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চায় দলটি।

সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আগ্রহী প্রার্থীদের কাছ থেকে আবেদনও আহ্বান করেছে এনসিপি। ঢাকা দক্ষিণ এনসিপির এক বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ৭৫টি সাধারণ ওয়ার্ড এবং ২৫টি সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদের বিপরীতে যোগ্য, সৎ ও জনমুখী প্রার্থীদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে দলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। এনসিপির মতে, জনগণের অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি এবং যোগ্য নেতৃত্বের সমন্বয়ই ঢাকাকে একটি আধুনিক, নিরাপদ ও মানবিক নগরীতে রূপান্তর করতে পারে এবং সেই লক্ষ্য পূরণে যোগ্য প্রতিনিধি নির্বাচন করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য।

প্রার্থী হিসেবে আগ্রহী ব্যক্তিদের জন্য কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও গুণাবলি নির্ধারণ করেছে দলটি। এর মধ্যে রয়েছে জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা, সৎ ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের মানসিকতা, নিজ নিজ ওয়ার্ডে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা এবং নগর সমস্যা ও নাগরিক সেবার বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা ও কাজ করার আগ্রহ। ইতিমধ্যেই অনেকেই আগ্রহ দেখিয়েছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

জুলাই আন্দোলনের সামনের সারির নেতাদের নিয়ে গঠিত এনসিপি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের হয়ে গত ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। জোটবদ্ধভাবে ৩০টি আসনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে দলের আহবায়ক ও সদস্য সচিবসহ ৬টি আসনে জয় লাভ করে দলটি। একইসঙ্গে জামায়াতের সঙ্গে সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায়ও থাকছে এনসিপি। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপও করা হয়েছে এনসিপি আহবায়ক নাহিদ ইসলামকে। ভবিষ্যতে হতে যাওয়া স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোতেও তারা একই ধারায় অংশ নেবে কি না, তা নিয়ে কৌতূহল রয়েছে। তবে আপাতত নিজেদের একক প্রস্তুতি এগিয়ে রাখতে চাইছে দলটি। হিসাব মিললে শেষ দিকে জোটগত ভাবে লড়ার সিদ্ধান্তও আসতে পারে।

এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে দলকে তৃণমূলে আরও চাঙ্গা হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। উপজেলা, পৌরসভাসহ অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে নির্বাচন করার সম্ভাবনাই বেশি। তবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলোতে জামায়াতের সঙ্গে জোটগতভাবে নির্বাচন করার আলোচনা আছে। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর এবং দক্ষিণ সিটি নির্বাচন নিয়ে ইতিমধ্যেই জামায়াতের সঙ্গে দর কষাকষি শুরু হয়েছে। ঢাকার দুই সিটিতে এনসিপি প্রার্থী দিতে আগ্রহী হলেও জামায়াতেরও প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানা গেছে। সমঝোতা হলে সেক্ষেত্রে একটি এনসিপিকে ছাড়া হতে পারে এমন আভাস পাওয়া গেছে।

এনসিপির নির্বাহী কমিটির এক সদস্য জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে আমরা একসাথে থাকছি। ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। এই দুই সিটিতে এনসিপির পক্ষ থেকে আমরা প্রার্থী দিতে চাই। সার্বিক প্রস্তুতি, জোটের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ও প্রার্থী কারা হবে তা নিয়ে দলের অভ্যন্তরে আলোচনা চলছে। দুই সিটি না হলে অন্তত এক সিটিতে জোটবদ্ধভাবে আমরা লড়তে চাই।

এনসিপির যুগ্ম আহবায়ক সারোয়ার তুষার আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, জামায়াত এনসিপি এখনো পর্যন্ত একসঙ্গে আছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত হবে। তবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলো সমঝোতার ভিত্তিতে হতে পারে। অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে এখনো আলোচনা নেই।

এনসিপি সূত্র বলছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে কারা প্রার্থী হচ্ছেন তা ঘোষণা করা হবে আজ রোববার। রাত ৯টায় এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এনসিপির আহবায়ক নাহিদ ইসলাম এই দুই সিটির প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করবেন।

আগামীর সময়ের হাতে আসা তথ্য মতে, এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূইয়াকে ঢাকা দক্ষিণ এবং সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রাথমিক প্রার্থী ঘোষণা করা হতে পারে। তবে ঢাকা দক্ষিণে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নামও আলোচনায় রয়েছে।

আসিফ মাহমুদ অন্তর্বর্তী সরকারের ছাত্র উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পদত্যাগের পর ঢাকা-১০ আসন থেকে নির্বাচন করার কথা জানালেও শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচন থেকে সরে গিয়ে এনসিপিতে যোগ দেন। পরে তাকে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান ও দলীয় মুখপাত্র করা হয়। অন্যদিকে নাসীরুদ্দীন ঢাকা-৮ আসনে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে অল্প ভোটের ব্যবধানে হেরে যান। যদিও ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলেছেন তিনি। ঢাকা উত্তরে আলোচনায় আছেন আরিফুল ইসলাম, তিনি এনসিপি ঢাকা মহানগর উত্তরের আহবায়কের দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকা-১৮ আসনে এনসিপির প্রার্থী হিসেবে ভালো লড়াইও করেছেন।

এনসিপির কেন্দ্রীয় এক নেতা জানিয়েছেন, দলের সভাগুলোতে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঢাকা উত্তরে সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক আরিফুল ইসলাম ও দক্ষিণে মুখপাত্র আসিফ মাহমুদের পক্ষে মতামত পাওয়া যাচ্ছে।

গত ২৩ ফেব্রুয়ারি দলীয়ভাবে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে এনসিপি। এই কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছেন এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। সদস্যসচিব করা হয়েছে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদকে।

জাতীয় নির্বাচন থেকে শিক্ষা নিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভালো প্রস্তুতি নিতে চায় এনসিপি, এমনটি জানিয়ে কমিটির চেয়ারম্যান সারজিস আলম বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনে এনসিপির প্রার্থী বাছাই থেকে শুরু করে, প্রার্থী ঘোষণা এমনকি নির্বাচনী জোটের ঘোষণার বিষয়গুলো একদম শেষ সময়ে হয়েছে। সে কারণে যতটুকু প্রস্তুতির সময় ও সুযোগ প্রয়োজন ছিল, তা পাওয়া যায়নি। সেই জায়গা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে এনসিপি।

‘আমরা আশা করছি যে, এককভাবে স্থানীয় পর্যায়ে আমরা প্রত্যেকটা জায়গায় প্রার্থিতা ঘোষণা করব। এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হচ্ছে আমরা এককভাবে এই লড়াইটার দিকে যাব। যদি শেষ সময় এরকম হয় আমরা সবার সঙ্গে বসে তবে যেটা বৃহৎ স্বার্থ থাকবে সেই স্বার্থকে সামনে রেখে আমরা আমাদের জায়গা থেকে সিদ্ধান্ত নেব। আশা করছি, আমাদের সাংগঠনিক বোঝাপড়ায় কোনো সমস্যা হবে না,’ যোগ করেন সারজিস।

সারজিস জানান, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রতিটি সিটি করপোরেশন, উপজেলা এবং পৌরসভায় এনসিপির প্রাথমিক প্রার্থী ঘোষণা করা হবে।

    শেয়ার করুন: