৬ মাসে সরকার মোটাদাগে ব্যর্থ, ফ্যাসিস্টের পথেই হাঁটছে : জামায়াত

সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়ন নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন মিয়া গোলাম পরওয়ার
বিএনপি সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রমকে ‘মোটাদাগে ব্যর্থ’ বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেছেন, ‘সরকার ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পথেই হাঁটছে।’
‘তবে সরকার ব্যর্থ হোক—এমনটি জামায়াত চায় না’ বলে উল্লেখ করে তিনি বললেন, ‘ভালো কাজে সরকারকে সহযোগিতা, আর মন্দ কাজের বিরোধিতা করা হবে।’
আজ মঙ্গলবার জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সংলগ্ন আল ফালাহ মিলনায়তনে বিএনপি সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়ন নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেছেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।
সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলছিলেন, ‘নির্বাচনের আগে জনসভাগুলোতে বিএনপি বিদ্যমান কাঠামো সংস্কার এবং জুলাই সনদের ভিত্তিতে গণভোটের রায় কার্যকর ও বাস্তবায়নের কথা বলেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর সরকার তা বাস্তবায়ন তো করেইনি, বরং এ বিষয়ে নেতিবাচক অবস্থান নিয়েছে। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিএনপির অবস্থানও পুরো জাতিকে বিস্মিত করেছে।’
তিনি বললেন, ‘১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। অথচ বিএনপি শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছে, সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি। অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দল দুই জায়গাতেই শপথ নিয়েছে। বিএনপি বলেছে, সংস্কার পরিষদের বিষয়টি সংবিধানে নেই। জাতির কাছে দেওয়া ওয়াদা তারা রক্ষা করতে পারেনি। এটি জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গ।’
গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতেও সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করেন জামায়াতের এই নেতা। তার ভাষ্য, ‘চট্টগ্রামের মহেশখালী ও পটুয়াখালীর পায়রায় টার্মিনাল করার কথা থাকলেও সেগুলোর অগ্রগতি সম্পর্কে জনগণ পরিষ্কারভাবে জানে না। খুলনার খালিশপুরে রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হলেও এখনো বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারেনি। দেশে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় জামায়াত সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিলেও সরকার তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করেনি।’
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয়করণের প্রসঙ্গ তুলে ধরে মিয়া গোলাম পরওয়ার বললেন, ‘জেলা-উপজেলা পর্যায় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বিএনপি নেতাদের বসানো হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য নিয়োগেও দলীয় বিবেচনার প্রভাব দেখা যাচ্ছে। যারা ১১ দলকে বেশি গালাগালি করতে পারছে, তাদেরই প্রমোশন হচ্ছে।’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সমালোচনা করে তিনি বলেছেন, ‘বিভিন্ন সংস্কার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ১৮০ দিনের মধ্যে প্রথম ১১০ দিনেই ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর পাশাপাশি ডাকাতি, অপহরণ, চুরি, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণের ঘটনাও বাড়ছে।’
ক্যাম্পাসগুলোতে সংঘাত ও হামলার প্রসঙ্গ তুলে সাবেক এ সংসদ সদস্য বলছিলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম জুলাই-পরবর্তী সময়ে আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রক্ত ঝরবে না। কিন্তু আলিয়া মাদ্রাসা, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদলের হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকাশ্যেই ছাত্রদল ও বিএনপিকে সহযোগিতা করছে।’
পররাষ্ট্রনীতিতেও সরকার ব্যর্থ হয়েছে উল্লেখ করেছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তার মতে, ‘শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা, ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের ফিরিয়ে আনা এবং রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় সরকার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এ সরকারের সময়ে সীমান্ত হত্যা ও পুশইনের ঘটনাও ঘটেছে। এসব বিষয়ে সরকার প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করেনি।’
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সমালোচনা করে সাবেক এ সংসদ সদস্য বলেছেন, ‘বাজারে এখনো স্বস্তি ফেরেনি। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্য। বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।’
ব্যাংকিং খাতের সংকট নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জামায়াতের এই নেতা। তার ভাষ্য, ‘খেলাপিঋণ বাড়ছে, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ইসলামী ব্যাংকসহ ব্যাংকিং খাতে সরকারের হস্তক্ষেপ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।’
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল এবং গুম কমিশনের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি জানালেন, ‘জুলাই-পরবর্তী সময়ে গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার ইস্যুতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল।’
কৃষি খাতের পরিস্থিতিকেও উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি। কৃষকরা উৎপাদিত ধানের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না উল্লেখ করে তিনি বললেন, ‘কৃষি উপকরণ ও সারের দাম বেড়েছে। কোথাও কোথাও খুচরা পর্যায়ে কয়েক গুণ বেশি দামে কৃষি উপকরণ কিনতে হচ্ছে। সার সংকট তৈরি হলে দেশে আরও অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।’
ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণেও অনিয়ম হয়েছে বলে দাবি করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, ‘দলীয় লোকজন ও সিন্ডিকেট এসব সুবিধা লুটপাট করে নিচ্ছে। যাচাই-বাছাইয়ের জন্য লোক নিয়োগ নিয়েও বিভিন্ন জায়গায় বিরোধ তৈরি হচ্ছে, যা দরিদ্র মানুষের জন্য নতুন বিড়ম্বনা সৃষ্টি করছে।’
শিক্ষা খাতে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন তিনি। এনটিআরসির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়ার প্রস্তাবের বিরোধিতা করে তিনি বললেন, ‘শিক্ষকদের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার উদ্যোগ সরাসরি সংবিধানবিরোধী। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করা প্রয়োজন। শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও নবম পে-স্কেল নিয়েও সরকারের দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে।’
স্বাস্থ্য খাতে নৈরাজ্য চলছে বলে অভিযোগ করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তার ভাষায়, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা ধরনের অসংগতি রয়েছে। একই বিষয়ে একেক ধরনের সিদ্ধান্ত দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ব্যাপক ঘাটতিও রয়েছে। হামসহ বিভিন্ন রোগে মানুষের মৃত্যুর জন্য আগের সরকারকে দায়ী করে বর্তমান সরকার নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে।’
উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ‘বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় উন্নয়ন কার্যক্রমে নানা ধরনের হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। সংরক্ষিত নারী আসনের একজন অনির্বাচিত সদস্যকে ব্যবহার করে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে।’
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি বললেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বাতিলের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়নি।’
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের কর্মকর্তারা এখনো সরকারের প্রশ্রয় পাচ্ছেন বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের রাজনীতি পুনর্বাসনের ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে।’
তবে সরকারের কিছু উদ্যোগকে জামায়াত ইতিবাচক হিসেবেও দেখছে বলে জানান তিনি। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ কিছুটা ভালো অবস্থায় রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘এর কৃতিত্ব সরকারের নয়, প্রবাসী রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের।’
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার যে কমিটি করেছে, সেটিকেও ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তবে এ উদ্যোগ গ্রহণে বিরোধী দলের দেওয়া প্রস্তাবের ভূমিকা ছিল বলে জানান।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ‘আমরা অনুরোধ করব, সরকার যেন এসব সমস্যার সমাধান করে। সরকার ব্যর্থ হোক, আমরা চাই না। সরকারকে ভালো কাজে সহযোগিতা করতে আমরা প্রস্তুত। তবে মন্দ কাজের বিরোধিতা আমরা করব। আমাদের রাজনৈতিক ভূমিকা সংসদেও চলবে, বাইরেও চলবে।’
বিএনপি সরকারের ছয় মাসে বিরোধী দলের ভূমিকা কেমন ছিল—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘জামায়াত নিয়মিত নিজেদের কর্মকাণ্ডও মূল্যায়ন করছে। সংসদে এবং সংসদের বাইরে তারা বিভিন্ন প্রস্তাব ও পরামর্শ দিয়ে আসছে এবং গঠনমূলক সমালোচনা করছে।’
তার ভাষ্য, ‘আমরা কোনো ধরনের হরতাল, ভাঙচুর বা এসব কর্মসূচি করছি না। আমরা সংসদে ও বাইরে আমাদের প্রস্তাবনা রেখে আসছি, পরামর্শ দিচ্ছি এবং গঠনমূলক সমালোচনা করছি।’
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, হামিদুর রহমান আযাদ, আব্দুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, মতিউর রহমান আকন্দ, শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল এবং ঢাকা মহানগর উত্তরের সেক্রেটারি রেজাউল করিম।











