ছয় মাসের ভুল শুধরে এগোতে হবে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং দীর্ঘদিনের নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের যে অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে একটি ফেয়ার ও ক্রেডিবল নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করা নিঃসন্দেহে দেশের জন্য একটি বড় ইতিবাচক মাইলফলক। গণপ্রত্যাশার বিশাল চাপ নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই সরকারের প্রথম ছয় মাসের পথচলাকে যদি আমরা নিরপেক্ষ চোখে বিশ্লেষণ করি, তবে সেখানে একদিকে যেমন রয়েছে শুভসূচনা ও গণতান্ত্রিক সদিচ্ছা, অন্যদিকে রয়েছে আন্তর্জাতিক সংকট, প্রশাসনিক অদূরদর্শিতা এবং নীতিগত ধোঁয়াশার এক জটিল মিশ্রণ।
রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ
রাষ্ট্র পরিচালনায় এই ছয় মাসের অন্যতম বড় সাফল্য হলো, রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত পরিবর্তন। অতীতে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করাকেও যেন ‘রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র’ হিসেবে গণ্য করা হতো। বিরোধী মতের ওপর ঢালাও নিপীড়ন, দমন-পীড়ন কিংবা কথা বলার স্বাধীনতাকে খর্ব করার যে কালচার বা সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে চর্চা হয়ে আসছিল, তা এখন অনেকটাই দূরীভূত হয়েছে বলে মনে হয়। বর্তমানে সরকারের সমালোচনা করা যাচ্ছে, মতামত প্রকাশ করা যাচ্ছে— এটি একটি মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের বড় আলামত।
তবে অভ্যন্তরীণ এই ইতিবাচক পরিবেশের পাশাপাশি সরকারকে শুরুতেই অত্যন্ত প্রতিকূল এক আন্তর্জাতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি আমাদের অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। ওই অঞ্চল থেকে বাংলাদেশ সিংহভাগ তেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল আমদানি করে থাকে। যুদ্ধের ফলে শুধু বিশ্ববাজারে তেলের দামই আকাশচুম্বী হয়নি; বরং পণ্যটির সহজলভ্যতা বা প্রাপ্তিও অত্যন্ত দুর্লভ হয়ে উঠেছে। ফলে দেশের আমদানি ব্যয় অসম্ভব পরিমাণে বেড়ে গেছে, যা সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। এ প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও অর্থনৈতিক অবস্থা সমৃদ্ধ রাখা ও সরবরাহ বজায় রাখতে সরকারের চেষ্টা অব্যাহত রাখাটা ইতিবাচক।
জনপ্রশাসন, রাজনৈতিক নিয়োগ ও ওএসডি বিতর্ক
সরকার তার নীতিতে মেধাভিত্তিক সিভিল সার্ভিস বা ‘মেরিট বেসড’ প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি দিলেও, ছয় মাসের মাঠপর্যায়ের চিত্রে তার প্রতিফলন কিন্তু মেলেনি; বরং দেখা যাচ্ছে ঠিক তার বিপরীত চিত্র।
প্রথমত, নিয়মিত দায়িত্ব পালনকারী দক্ষ ও তরুণ কর্মকর্তাদের টপকে বিপুলসংখ্যক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে বিভিন্ন সংস্থায় বসানো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যারা নিয়মিত চাকরিতে আছেন, তাদের বাদ দিয়ে ঢালাওভাবে রিটায়ার্ড লোকজনকে ফিরিয়ে আনা সিভিল সার্ভিসের সুসংগঠিত কাঠামোর জন্য মোটেই স্বাস্থ্যকর নয়। এই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ধারা ধীরে ধীরে কমিয়ে ফেলা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, অতীতে যা কখনো ঘটেনি— এমন কিছু সংস্থায় রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্রশাসনিক ও টেকনিক্যাল পদগুলোতে বসানো হচ্ছে। বিসিক কিংবা বিআইডব্লিউটিএর মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অন্তত ১০-১১টি বিশেষায়িত সংস্থায় রাজনৈতিক নেতাদের চেয়ারম্যান ও অন্যান্য নীতিনির্ধারণী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এমনকি ওয়াসার মতো কারিগরি ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে যেখানে একজন পেশাদার ম্যানেজিং ডিরেক্টর বা চেয়ারম্যান দরকার, সেখানে দলীয় নেতাদের পদায়ন করা হয়েছে। এসব নেতা পদে থাকা অবস্থায় দলীয় পদ থেকেও পদত্যাগ করেননি; তারা একই সঙ্গে দাপ্তরিক কাজ করছেন আবার রাজনৈতিক মিটিং-মিছিলেও নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সিটি করপোরেশনে নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসক হিসেবে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে বসানো হয়তো যুক্তিযুক্ত হতে পারে; কিন্তু কারিগরি, সেবামূলক ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় রাজনৈতিক ব্যক্তি বসানো হলে সেসব সংস্থার স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ও মূল লক্ষ্যই মুখ থুবড়ে পড়বে।
তৃতীয়ত, প্রশাসনে ঢালাওভাবে কর্মকর্তাদের ওএসডি (OSD) করা এবং জোরপূর্বক বা তড়িঘড়ি করে অবসরে পাঠানোর একটি ধারা সৃষ্টি হয়েছে, যা সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চরম ভুল-বোঝাবুঝি, অনিশ্চয়তা ও হতাশার জন্ম দিচ্ছে। অতীতে কোনো কর্মকর্তা যদি সত্যি অপরাধ করে থাকেন বা কোনো অন্যায় কার্যকলাপে জড়িত থাকেন, তবে অবশ্যই তদন্তের মাধ্যমে নিয়মিত মামলা বা বিভাগীয় মামলা করে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। কিন্তু তদন্ত ছাড়া ঢালাও প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা জনপ্রশাসনের পেশাদারিত্ব কিংবা মান উন্নয়নে কোনো ভূমিকা রাখে না। সরকারের এ বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার।
গণপ্রত্যাশার বিশাল চাপ নিয়ে যাত্রা শুরু করা সরকারের প্রথম ছয় মাসের পথচলাকে যদি আমরা নিরপেক্ষ চোখে বিশ্লেষণ করি, তবে সেখানে একদিকে যেমন রয়েছে শুভ সূচনা ও গণতান্ত্রিক সদিচ্ছা, অন্যদিকে রয়েছে আন্তর্জাতিক সংকট, প্রশাসনিক অদূরদর্শিতা এবং নীতিগত ধোঁয়াশার এক জটিল মিশ্রণ
প্রশাসনিক মিতব্যয়িতা বনাম সুশাসনের ঘাটতি
প্রশাসনিক সংস্কার ও রাষ্ট্রীয় ব্যয় সংকোচনে সরকার কিছু প্রশংসাযোগ্য কাজ করেছে। যেমন— প্রধানমন্ত্রীর জন্য ভিআইপি প্রটোকল উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে, সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে আগে বিদ্যমান করমুক্ত গাড়ি ও প্লট সুবিধা পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় অপচয় রোধে কার্যকর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে এসবের বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক সংস্কার ও দুর্নীতি দমনে সুস্পষ্ট কোনো রূপরেখা দেখা যায়নি। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দিকে তাকালেই সরকারের এ স্থবিরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তৎকালীন কমিশন পদত্যাগ করার পর দীর্ঘ চার-পাঁচ মাস নতুন কমিশন নিয়োগ না দিয়ে পদগুলো খালি রেখে দেওয়া হয়েছিল। আইনি বিধান অনুযায়ী, কমিশন সচল না থাকলে সংস্থার কর্মকর্তারা কোনো মামলার নতুন এফআইআর (FIR) করতে পারেন না; কিংবা চার্জশিট অনুমোদন দিতে পারেন না। দুর্নীতি দমনের মতো একটি স্পর্শকাতর ও জরুরি কাজে কমিশনবিহীন একটি দীর্ঘ সময় পার করা দুর্নীতিবিরোধী লড়াইকেই দুর্বল করে দিয়েছে।
মূল্যস্ফীতি, বাজার নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক সুরক্ষা
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য ও মূল্যস্ফীতি বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ। চাল, ডাল, তেলসহ দৈনন্দিন বাজার খরচের সঙ্গে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার যে বিস্তর ফারাক বা মিসম্যাক সৃষ্টি হয়েছে, তা রাতারাতি সমাধানের বিষয় নয়। এটি মূলত দীর্ঘদিনের জমে থাকা একটি কাঠামোগত অর্থনৈতিক সমস্যা। ছয় মাসের মতো অল্প সময়ে বাজার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি না আসা পর্যন্ত এ সমস্যাটি কমবেশি বজায় থাকবে। জনগণকে স্বস্তি দিতে সরকারকে বাজার মনিটরিং বজায় রেখে সময়ের সঙ্গে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
একই সময়ে সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের কিছু পদক্ষেপে আশার আলো দেখা গেছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড বিতরণ, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতা বাড়ানো এবং প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ প্রশংসনীয়। কিন্তু অতীতে যেমনটি ঘটেছে, এসব জনকল্যাণমুখী প্রকল্পে যেন কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ কিংবা দুর্নীতি ছড়িয়ে না পড়ে, সে ব্যাপারে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
ছয় মাস একটি সরকারের সার্বিক সক্ষমতা পরিমাপ করার জন্য খুব দীর্ঘ সময় নয়। এই স্বল্প সময়ে বিএনপি সরকার একটি ফেয়ার নির্বাচনের মাধ্যমে এসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং মিতব্যয়িতার কিছু ইতিবাচক উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি আমলাতন্ত্রকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা, অভিজ্ঞ ও নিয়মিত কর্মকর্তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা তৈরি করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়াই হবে তারেক রহমানের সরকারের আসল পরীক্ষা। জনআকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতে সরকারকে নিজের ভুলগুলো শুধরে নিয়ে আরও সুসংগঠিতভাবে সামনের দিকে এগোতে হবে।
লেখক: মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব ও অন্তর্বর্তী সরকারের একজন সাবেক উপদেষ্টা







