বাংলাদেশের এআই চ্যালেঞ্জ: ভোক্তা নাকি নির্মাতা?

ড. মোহাম্মদ আসিফ হোসেন খান
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে আমাদের আলোচনায় দুটি চরম প্রান্ত খুব সহজে দেখা যায়। এক প্রান্তে উচ্ছ্বাস— এআই এসে গেছে, এবার সব বদলে যাবে। অন্য প্রান্তে আতঙ্ক— চাকরি চলে যাবে, মানুষ অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে। বাস্তবতা, এই দুইয়ের কোনোটিই নয় এবং সে কারণেই প্রশ্নটা ঠিকভাবে করা জরুরি। আগামী তিন-চার বছরে বাংলাদেশের প্রকৃত এআই চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তিগত নয়, কাঠামোগত। প্রযুক্তি কিনতে পাওয়া যায়, কাঠামো কিনতে পাওয়া যায় না।
আমার দৃষ্টিতে, নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে মূলত পাঁচটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
প্রথমত, দক্ষ জনবলের সংকট এবং মেধা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ: আমাদের সমস্যাটি শুধু প্রশিক্ষণের সংকট নয়; বরং মেধাবীদের ধরে রাখার সংকট। প্রতি বছর দেশে হাজার হাজার তরুণ কম্পিউটার বিজ্ঞান ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক হচ্ছেন। কিন্তু এআই ব্যবস্থা নির্মাণের জন্য যে স্তরের দক্ষতা প্রয়োজন, তা কেবল একটি এআই মডেল ব্যবহার করার জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মডেলটি কেন কাজ করে ও কোথায় ব্যর্থ হয়, তা বোঝার ক্ষমতা। দুঃখজনকভাবে, সেই স্তরের মানুষ আমাদের হাতে খুব কম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ দুই যুগের বেশি সময় ধরে শিক্ষকতা ও গবেষণার সুবাদে যেটি আমি প্রতি বছর সামনে থেকে দেখি, তা হলো আমাদের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ঠিকানা প্রায় সবসময়ই বিদেশে। এটিকে শুধু ‘মেধা পাচার’ বলে আক্ষেপ করলে হবে না। দেশে গবেষণার সুযোগ, প্রতিযোগিতামূলক বেতন এবং গুরুত্বপূর্ণ সমস্যায় কাজ করার সুযোগ না দিতে পারলে মেধাবীদের ধরে রাখা যাবে না। এটি আবেগের প্রশ্ন নয়, প্রণোদনার প্রশ্ন।
মূল কাজটি শুরু হতে হবে আরও আগে, শ্রেণিকক্ষে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য আইসিটি পাঠ্যবই লিখতে গিয়ে আমি অনুভব করেছি, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে মুখস্থবিদ্যা থেকে সমস্যা-সমাধানের দিকে সরাতেই হবে। যে প্রশ্নের উত্তর এআই পাঁচ সেকেন্ডে দিতে পারে, সেটি পরীক্ষায় দেওয়া অর্থহীন। পাশাপাশি লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কাছেও এই জ্ঞান পৌঁছাতে হবে, নইলে এআই দক্ষতা রাজধানীকেন্দ্রিক একটি বিশেষাধিকারে পরিণত হবে।
দ্বিতীয়ত, ডেটার দুষ্প্রাপ্যতা ও সুরক্ষা: এআই ডেটানির্ভর একটি প্রযুক্তি। আমাদের দুটি বিপরীতমুখী সমস্যা রয়েছে। একদিকে বাংলা ভাষার মানসম্মত, উন্মুক্ত ডেটাসেট বিস্ময়করভাবে কম। লো-রিসোর্স ল্যাঙ্গুয়েজ এবং ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং (NLP) নিয়ে আমার দীর্ঘদিনের গবেষণার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বাংলা স্পেল চেকার বা পার্সারের মতো টুলস তৈরি হলেও বিশ্বের বড় মডেলগুলোতে বাংলা সবসময়ই দ্বিতীয় সারির ভাষা। অনুবাদ ঠিকঠাক করতে পারলেও আমাদের প্রশাসনিক পরিভাষা, আইনি ভাষা বা কৃষি-স্বাস্থ্যের স্থানীয় প্রেক্ষাপট এআই মডেলগুলো ঠিকমতো ধরতে পারে না। অন্যদিকে, রাষ্ট্রের হাতে বিপুল পরিমাণ ডেটা আছে, যা বিচ্ছিন্ন সাইলোয় বন্দি, গবেষকের নাগালের বাইরে, অথচ যথাযথ সুরক্ষাও নেই। এর সমাধান হলো, একটি সুস্পষ্ট ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা কাঠামো তৈরি এবং পাশাপাশি বেনামীকৃত (Anonymized) সরকারি ডেটা গবেষণার জন্য উন্মুক্ত করার নীতি গ্রহণ করা।
তৃতীয়ত, বাস্তবসম্মত ও সার্বভৌম অবকাঠামো: এআই বলতেই বিশাল জিপিইউ ক্লাস্টার আর নিজস্ব ভাষা-মডেল বানানোর কথা ওঠে। এখানে বাস্তববাদী হওয়া দরকার। শূন্য থেকে ফ্রন্টিয়ার মডেল বানানোর দৌড়ে আমাদের নামা উচিত নয়; সেটি কয়েক বিলিয়ন ডলারের খেলা। আমাদের প্রয়োজন এমন সার্বভৌম কম্পিউটিং সক্ষমতা, যা দিয়ে বিদ্যমান প্রিট্রেইনড ওপেন-সোর্স মডেলকে বাংলা ও বাংলাদেশি প্রেক্ষাপটে ট্রেইন করা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেলের ফাউন্ডিং ডিরেক্টর হিসেবে সাত বছর কাজ করার সময় আমি দেখেছি, সঠিক ওপেন-সোর্স প্রযুক্তি ব্যবহার করে কীভাবে অত্যন্ত সাশ্রয়ী ও স্কেলেবল ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি করা যায়। ঠিক এভাবেই আমাদের জাতীয় পর্যায়ের ডেটা সেন্টারগুলোকে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেশের ভেতরেই সংবেদনশীল ডেটা নিয়ে কাজ করতে পারেন। আজ একজন পিএইচডি শিক্ষার্থীকে গবেষণার জন্য বিদেশি ক্লাউডে ডলার খরচ করতে হয়, যা আমাদের গবেষণা-অবকাঠামোর রুগ্ণ চিত্রটি নগ্নভাবে ফুটিয়ে তোলে।
চতুর্থত, শ্রমবাজারের নীরব পুনর্বিন্যাস: বাংলাদেশে একটি বিশাল ফ্রিল্যান্সিং ও বিপিও খাত আছে, যার ভিত্তিই ছিল সস্তায় পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ (Repetitive tasks) সরবরাহ। সাধারণ কনটেন্ট লেখা, রুটিন কোডিং বা ডেটা এন্ট্রি ইত্যাদি। এআই ঠিক এ কাজগুলোই সবচেয়ে আগে শুষে নিচ্ছে। ভয়টা এখানে গণছাঁটাইয়ের নয়, দামের। কাজ থাকবে, কিন্তু প্রতি ঘণ্টার মূল্য কমতে থাকবে। আশার দিক হলো, যারা এআই সরঞ্জাম রপ্ত করে উঁচু স্তরের কাজে উঠতে পেরেছেন, তাদের আয় বেড়েছে। অর্থাৎ, বিভাজন রেখাটা এআই বনাম মানুষ নয়, এআই সজ্জিত মানুষ বনাম এআই-বঞ্চিত মানুষ। নীতিগত কাজটি তাই স্পষ্ট— ঘণ্টা ভাড়া দেওয়ার অর্থনীতি থেকে পণ্য ও সেবা মালিকানার অর্থনীতিতে ওঠার সিঁড়ি তৈরি করা।
পঞ্চমত, আস্থা, নৈতিকতা ও শাসনব্যবস্থা: জাতীয় এআই নীতিমালার খসড়া প্রকাশিত হয়েছে, যা ইতিবাচক। কিন্তু ঝুঁকিগুলো এখন আর তাত্ত্বিক নয়; ডিপফেক দিয়ে চরিত্র হনন, কণ্ঠস্বর নকল করে আর্থিক প্রতারণা, এআই-নির্মিত গুজবের দ্রুত বিস্তার এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশের ইন্স্যুরেন্স খাতের ডিজিটালাইজেশন প্রজেক্টে এবং ক্যাপিটাল মার্কেটে সিসিবিএল (CCBL)-এ কাজ করার সুবাদে এআই-নির্ভর ফিনটেক ও জালিয়াতি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে ডেটা কমপ্লায়েন্সের গুরুত্ব আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। সরকারি বা আর্থিক সেবায় এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি নীতি এখনই ঠিক করা দরকার আর তা হলো, এআই হয়তো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সুপারিশ করতে পারবে; কিন্তু চূড়ান্ত দায়ভার একজন চিহ্নিত মানুষের ওপরই থাকতে হবে (Human-in-the-loop)। অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নেওয়া স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত একবার ভুল করলে মানুষের মধ্যে যে অনাস্থা তৈরি হবে, তা পুনরুদ্ধারে এক দশক লেগে যেতে পারে।
পরিশেষে বলতে চাই, এই পাঁচটি চ্যালেঞ্জের একটিও এমন নয় যে, সমাধান আমাদের অজানা। ঘাটতিটা জ্ঞানের নয়, ধারাবাহিকতার। এআইর ক্ষেত্রে বিলম্বের খরচ অন্য প্রযুক্তির চেয়ে অনেক বেশি, কারণ এখানে সুবিধা চক্রবৃদ্ধি হারে জমে। মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেটের বেলায় আমরা দেরিতে শুরু করেও ধরে ফেলতে পেরেছিলাম। কারণ, ওগুলো ছিল মূলত ভোগের প্রযুক্তি। এআই উৎপাদনের প্রযুক্তি। এখানে দেরি করে ধরে ফেলা অসম্ভব। আগামী দুই-তিন বছরে আমাদের সিদ্ধান্তগুলোই ঠিক করে দেবে, বাংলাদেশ বৈশ্বিক এআই অর্থনীতিতে শুধু একজন ‘ভোক্তা’ হিসেবে থাকবে, নাকি ‘নির্মাতা’ হিসেবে অংশ নেবে।
লেখক: অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়




