‘নতুন দিনের অঙ্গীকার, স্কাউটিং হোক সবার’

সংগৃহীত ছবি
আজ ৮ এপ্রিল, বাংলাদেশ স্কাউটস দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘নতুন দিনের অঙ্গীকার, স্কাউটিং হোক সবার’। এবারের এই প্রতিপাদ্য শুধু একটি স্লোগান নয়; বরং নতুন প্রজন্মের জন্য সময়োপযোগী এবং অর্থবহ আহ্বান।
স্কাউটিংয়ের সূচনা হয় ১৯০৭ সালে। এর প্রবর্তক রবার্ট স্টিফেনসন স্মিথ লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল। ব্রিটেনের ব্রাউন্সি দ্বীপে প্রথম স্কাউট কার্যক্রম শুরু করেছিলেন তিনি। স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালের ৮ এপ্রিল স্কাউটিং কার্যক্রমের সূচনা হয় বাংলাদেশে। বর্তমানে বিশ্বের ১৭৬টি দেশে প্রায় ছয় কোটি শিশু-কিশোর ও যুবক কাজ করছে স্কাউট প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করে আত্মনির্ভরশীল ও পরোপকারী নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার লক্ষ্যে।
স্কাউটিং শ্রেণিকক্ষের বাইরের বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে চরিত্র, দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ ও মানবিকতার বিকাশ ঘটায় শিশু-কিশোরদের। এটি একটি জনপ্রিয়, অরাজনৈতিক, স্বেচ্ছাসেবী ও শিক্ষামূলক যুব আন্দোলন, যা শিশু-কিশোর ও যুব সমাজের অবসর সময়কে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে বৈচিত্র্যময় কর্মসূচির মাধ্যমে বিকশিত করে তাদের সুপ্ত প্রতিভা। স্কাউট প্রতিজ্ঞা ও আইন অনুসরণ এবং নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে ব্যক্তি, সমাজ ও দেশের সেবায় আত্মনিয়োগের মানসিকতা অর্জন করে স্কাউটরা।
ছয় কোটির বেশি স্কাউট ও প্রাপ্তবয়স্ক স্বেচ্ছাসেবীর সমন্বয়ে স্কাউটিং আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম যুব আন্দোলন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বর্তমান বৈশ্বিক জনসংখ্যা প্রায় ৮২৬ কোটি। এর মধ্যে সক্রিয়ভাবে স্কাউটিংয়ের মাধ্যমে যুবসমাজের বিকাশে অবদান রাখছে প্রায় ০.৭৩ শতাংশ মানুষ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে ১৫-১৯ বছর বয়সীদের হার সর্বোচ্চ ১০.০৩ শতাংশ। এছাড়া ১৫ বছরের কম বয়সী জনসংখ্যা ২৮.৬০ শতাংশ এবং ৩০ বছরের কম বয়সী জনসংখ্যা ৫৬.৪২ শতাংশ। অর্থাৎ, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশই শিশু ও তরুণ, যাদের সঠিক উন্নয়ন, দিকনির্দেশনা ও দক্ষতা বিকাশ সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে ৬ বছর থেকে ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু-কিশোর ও তরুণদের নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ স্কাউটস। বর্তমানে বাংলাদেশ স্কাউটসের সদস্য সংখ্যা প্রায় ২৪ লাখ ৩৪ হাজার, যা বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করেছে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম স্কাউট দেশ হিসেবে। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, দেশের বিশাল যুবসমাজকে উন্নয়নের ধারায় যুক্ত করতে কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করছে স্কাউটিং।
বয়সভেদে শিশু ও তরুণদের মানসিক চাহিদা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হয়। এ কারণে স্কাউটিং কার্যক্রম কাব স্কাউট, স্কাউট এবং রোভার স্কাউট শাখায় বিভক্ত। ৬ বছরের বেশি কিন্তু ১১ বছরের কম বয়সের বালক-বালিকারা থাকে কাব স্কাউট শাখায়। ১১ বছর বা তার বেশি বয়সী কিন্তু ১৭ বছরের কম কিশোর-কিশোরীরা থাকে স্কাউট শাখায়। আর রোভার স্কাউট শাখায় থাকে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অথবা ১৭ বছর বা তার বেশি বয়সী কিন্তু ২৫ বছরের কম তরুণ-তরুণী।
শিশুদের সততা, সহনশীলতা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ, সময়ানুবর্তিতা, পরোপকারিতা ও দেশপ্রেমের মতো মৌলিক মূল্যবোধ শেখায় স্কাউটিং। ক্যাম্পিংসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা শেখে নিজের কাজ নিজে করা, দায়িত্ব গ্রহণ, দল পরিচালনা, যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি, সময় ব্যবস্থাপনা এবং প্রকৃতিতে টিকে থাকার বাস্তব কৌশল। পারদর্শিতা ব্যাজ অর্জনের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে নতুন দক্ষতা ও জ্ঞান অর্জন করে স্কাউটরা। পাশাপাশি রক্তদান, ত্রাণ বিতরণ ও সমাজসেবামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে মানবিক, সহমর্মী ও সেবামুখী মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে তারা।
উল্লেখিত গুণাবলি অর্জনের লক্ষ্যে ছাত্রজীবনে শিশু-কিশোর ও যুব বয়সীরা নিজ নিজ শাখার নির্ধারিত প্রোগ্রাম যথাযথভাবে সম্পন্ন করার মাধ্যমে সুযোগ পায় বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ অ্যাওয়ার্ড অর্জনের। কাব স্কাউট শাখায় রয়েছে শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড, যা একজন কাব স্কাউটের জন্য সর্বোচ্চ সম্মাননা। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করা হয় বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষরসম্বলিত সনদপত্রসহ এই অ্যাওয়ার্ড। স্কাউট শাখায় রয়েছে প্রেসিডেন্টস স্কাউট অ্যাওয়ার্ড, যা প্রদান করা হয় রাষ্ট্রপতি এবং বাংলাদেশ স্কাউটসের চিফ স্কাউটের স্বাক্ষরসম্বলিত সনদপত্রসহ। একইভাবে রোভার স্কাউট শাখায় প্রেসিডেন্টস রোভার স্কাউট অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়, যা একজন রোভার স্কাউটের জন্য সর্বোচ্চ অর্জন হিসেবে বিবেচিত।
স্কাউটরা দীক্ষা নেন পতাকা স্পর্শ করে প্রতিজ্ঞা পাঠের মাধ্যমে। এই প্রতিজ্ঞায় সৃষ্টিকর্তার প্রতি কর্তব্য পালন, দেশের প্রতি কর্তব্য পালন, সর্বদা অপরকে সাহায্য করা এবং স্কাউট আইন মেনে চলার অঙ্গীকার করে তারা। এছাড়া, নিজেদের কর্মযাত্রায় তিনটি মূলমন্ত্রকে অঙ্গীকার হিসেবে গ্রহণ করে স্কাউটরা। যথা- নিজের প্রতি কর্তব্য পালন, সৃষ্টিকর্তার প্রতি কর্তব্য পালন এবং অপরের প্রতি কর্তব্য পালন। এই আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল, নৈতিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে তারা।
শিশুর সর্বাঙ্গীণ বিকাশ, সঠিক মানসিক গঠন এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য স্কাউটিং আজকের যুগে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ও বাস্তবসম্মত পথ। সন্তানকে স্কাউটিংয়ে যুক্ত করা শুধু একটি সিদ্ধান্ত নয়, এটি আজীবনের বিনিয়োগ। তার জীবনে শৃঙ্খলা, নৈতিক মূল্যবোধ, দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং উজ্জ্বল ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের দৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করবে স্কাউটিং।
লেখক : রোভার স্কাউট লিডার, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এয়ার রোভার স্কাউট গ্রুপ
















