নাগরিকের চোখে জলমগ্ন চট্টগ্রাম

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
টানা কয়েক দিন ধরে মুষলধারে বৃষ্টি। পড়ছে তো পড়ছেই। তীব্র জলাবদ্ধতার কবলে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। নগরীর কাতালগঞ্জ, বহদ্দারহাট ও চকবাজারসহ বিভিন্ন নিচু এলাকা তলিয়ে স্থবির হয়ে গেছে জনজীবন।
চট্টগ্রামে বৃষ্টি এখন আর শুধু আবহাওয়ার খবর নয়। এটি একটি প্রশাসনিক পরীক্ষাও। আর সেই পরীক্ষায় প্রতিবছরই আমরা অকৃতকার্য হই। কারণ প্রশ্নপত্র তৈরি করে প্রকৃতি। উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে নগর ব্যবস্থাপনা।
গতকাল একটি বিয়েতে যাওয়ার কথা ছিল। আনুষ্ঠানিক পোশাকেই বের হয়েছিলাম। একজনকে বাসা থেকে নিয়ে যেতে হবে অনুষ্ঠানে। সিএনজি চালিত অটোরিকশা ঠিক করে রওনা দিয়েছি। যদিও গাড়ি পেতে পেতে পুরোই কাকভেজা হয়ে যাই। অনুষ্ঠানে অনেকের সঙ্গে দেখা। ফিরছি যখন রাত প্রায় ১টা। অনেক কষ্টে একটি রিকশা পেলাম।
বৃষ্টি একটু কমেছে, কিন্তু রিকশা ঝড়ো বাতাসে দুলছে। শহরের রঙিন আলো বৃষ্টির জলে যেন ভেঙে ভেঙে পড়ছে। দৃশ্যটা কবিতার মতোই, কিন্তু ততক্ষণই, যতক্ষণ চলন্ত ট্রাক আর দুটি অটোরিকশা রাস্তার জমে থাকা পানি শরীরজুড়ে ছিটিয়ে দেয়।
রিকশা এসে দাঁড়াল বাসার নিচে। বাড়তি ভাড়ার আবদার ছিল, তা মিটিয়েই ঘরে ঢুকলাম। নিরাপত্তাপ্রহরী বললেন, পানি উঠতে পারে। গ্যারেজে রাখা ভেসপা যেন একটু উঁচুতে তুলে রাখি। চট্টগ্রামে বর্ষাকালে নিরাপত্তাপ্রহরীরাই সম্ভবত সবচেয়ে নির্ভুল আবহাওয়াবিদ।
ঘরে ঢুকতেই বাইরের আকাশ নতুন করে কাঁদতে শুরু করল। সেই বৃষ্টি দেখে ছাতা নিয়ে ছাদে উঠলাম। হালকা ভিজলাম। ফিরে এসে কাঁথা মুড়ি দিলাম। স্বপ্নে দেখলাম চসিক মেয়র বলছেন, ‘শহরের কোথাও কোনো পানি নেই।’
অথচ আমি বিছানাসহ পানিতে ভাসছিলাম। ঘুম ভাঙার পর টের পেলাম, স্বপ্নটা অবাস্তব। সম্ভবত এমন কোনো নিউজ দেখেই ঘুমিয়েছিলাম।
অনেক বছর আগে নগরীর মাছুয়া ঝর্ণা এলাকায় একটি মেসে থাকা হত। তখন এক সকালে আমরা ৫ মেস মেম্বার এভাবেই বেডসহ পানিতে ভাসছিলাম। ভোরের দিকে ঘরে পানি ঢুকেছিল সেদিন।
স্বপ্নে সিনেমার কোনো শেষ নেই। এপাশ-ওপাশ করতে করতে ঘুম ভাঙল। বাইরে তখনও ঝড়ো বাতাস আর বৃষ্টির ছটা। মা রীতিমত চিৎকার করছিলেন। জানলা ও বেলকনি দিয়ে অবিরত বৃষ্টির ছটা ঢুকছিল।
শুরু হলো বেলকনিতে পলিথিন সাঁটানোর যুদ্ধ। সোশ্যালে ঢুকে দেখি পরিচিতদের হাহাকার। শহর পানিবন্দী। সবাই যেন একটাই পোস্ট লিখছে—চট্টগ্রাম সাগর হয়ে গেছে।
ফোনে সহকর্মীদের খোঁজ নিলাম। ইয়ার এন্ডিং ভ্যাকেশন চলছে স্কুলে। কাতালগঞ্জ বলে কথা! যা ধারণা তার চেয়েও বেশি পানি উঠছে। এটিই নাকি নগরীর প্রথম আবাসিক এলাকা। এর মধ্যেও মা খিচুড়ি রান্না করলেন। সঙ্গে ডিমভাজি আর শুকনো মাংস। বিষয়টি মনে করিয়ে দিল, দুর্যোগের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ত্রাণ এখনো মায়ের রান্নাঘরেই তৈরি হয়।
গ্যারেজে ভেসপাটা আছে। সঙ্গে সাইকেল। নিচে নেমে দেখি টায়ার ডুবে গেছে। বহু কষ্টে একটু উঁচুতে তুললাম। ছাদ গিয়ে দেখি চাঁন্দগাও আবাসিকের রাস্তাগুলো নদীর মতো দেখাচ্ছে। আর ফেসবুকে প্রতি স্ক্রলে পানি আর পানি।
ঘণ্টা দুয়েক পর নিচে নামি। যে ভেসপা উঁচুতে তুলেছিলাম, সেটিও ডুবে গেছে। পানি এত বেড়েছে সিঁড়িও দেখা যাচ্ছে না। ফোন বের করে ভিডিও করছিলাম। কিন্তু পানিতে তলিয়ে যাওয়া সিঁড়িতে পা হড়কে গলা পর্যন্ত ডুবে গেলাম। গোড়ালি মচকাল। কোনো রকমে উঠে দাঁড়ালাম। মনে হলো, শহরের উন্নয়নের বড় প্রতীক হয়তো উড়ালসেতু নয়; অদৃশ্য হয়ে যাওয়া সিঁড়ি।
গন্তব্য ছিল চারুকলা। সেখানকার কুকুরগুলো প্রতিদিন অপেক্ষায় থাকে। গেটে পৌঁছাতেই ছুটে আসে, কী আনন্দ তাদের! প্রশাসনিক জটিলতায় শহরের চারুকলা ক্যাম্পাস বন্ধ অনেকদিন। রানিং স্টুডেন্টরা মূল ক্যাম্পাসে ফিরে গেছে। রশীদ চৌধুরী হলে কিছু অনুজ এখনো থাকে। আর নিরাপত্তাপ্রহরীদের সাথে থাকে ৫-৭টা অবুঝ প্রাণী।
ক্যাম্পাস বন্ধ থাকলেও তাদের তো ক্ষুধা লাগে। কুকুরগুলো পথ চেয়ে বসে থাকে। ওদের জন্য কিছু খাবার নিয়ে যেতেই পানির মধ্যে বের হওয়া। কিন্তু জলাবদ্ধ শহরে সম্ভব হলো না। শেষ পর্যন্ত কয়েকজনকে ফোনে অনুরোধ করলাম, যেন তারা এই অবুঝ প্রাণীগুলোর জন্য কিছু খাবারের ব্যবস্থা করে।
এই ঘটনাটাই হয়তো জলাবদ্ধতায় আটকে যাওয়ার একটি নির্মম উদাহরণ। অথচ প্রতি বর্ষায় একই প্রতিশ্রুতি শুনি— এবার আর পানি উঠবে না। ফের একই দৃশ্য দেখি। মানুষ কোমরসমান পানিতে হেঁটে বাড়ি ফিরছে। ড্রেনে তলিয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ মারা যাচ্ছে। অন্যদিকে অ্যাম্বুলেন্স আটকে যাচ্ছে। দোকান ডুবে যাচ্ছে। মিডিয়ায় আশ্বাস, ব্যাখ্যা আর দোষারোপ।
সমস্যা আসলে বৃষ্টি নয়। পৃথিবীর বহু শহরে বেশি বৃষ্টি হয়। কিন্তু সেখানে বৃষ্টি কোনো আতঙ্ক নয়। এখানে বৃষ্টি মানেই বিদ্যুৎ থাকবে না, রাস্তা ডুববে, গাড়ি বন্ধ হবে, ড্রেন উপচে পড়বে, মানুষ আটকা পড়বে। প্রকৃতির ওপর তো আর নিয়ন্ত্রণ নেই। কিন্তু ড্রেন পরিষ্কার রাখা, খাল দখলমুক্ত করা, পানিপ্রবাহ সচল রাখা, পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলা— এসব তো প্রকৃতির কাজ নয়।
বর্ষার পানিকে আমরা দোষ দিই, অথচ ভুলে যাই— পানি কখনো নিজের রাস্তা ভুলে না। রাস্তা ভুলে যায় মানুষ। আমরা খাল ভরাট করি, নালা দখল করি, পরিকল্পনাহীন উন্নয়নের নামে কংক্রিটের জঙ্গল বানাই। তারপর বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করি— পানি যায় কোথায়? উত্তরটা সহজ। পানি কোথাও যায় না। আমরাই তার পথ বন্ধ করে দিয়েছি।









