গতি যদি থাকে, ভবিষ্যৎ কথা বলবে

সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচন এক অনিবার্য সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হবে। ২০২৪ সালের ছাত্র-আন্দোলন; ড. ইউনূস সরকারের দেড় বছরের আমল পেরিয়ে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল ব্যবধানে বিজয় অর্জন করে এবং দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এই শপথ কেবল সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; বরং তা ছিল পরিবর্তনের প্রত্যাশায় মুখর এক জাতির সামনে নতুন নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করার মুহূর্ত।
প্রত্যাশার প্রেক্ষাপট: আন্দোলন থেকে নির্বাচনে
২০২৪ সালের ছাত্র-আন্দোলন দেশের রাজনীতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সেই আন্দোলন ছিল জবাবদিহিতা, সুশাসন ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের দাবিতে স্পষ্ট উচ্চারণ। দীর্ঘদিনের নির্বাচনী বিতর্ক, প্রশাসনিক অদক্ষতা, দুর্নীতির অভিযোগ এবং অর্থনৈতিক চাপ— সব মিলিয়ে জনমনে যে অসন্তোষ জমে ছিল, তা বিস্ফোরিত হয় রাজপথে।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের নির্বাচন কেবল সরকার পরিবর্তনের সুযোগ নয়; রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনেরও সম্ভাবনা। জনগণ নতুন সরকারের কাছে শুধু উন্নয়ন নয়, নৈতিক মানদণ্ডেরও পুনর্নির্মাণ প্রত্যাশা করে।
তারেক রহমান: প্রতিশ্রুতি থেকে কর্মতৎপরতা
নির্বাচনী ইশতেহারে তারেক রহমান অর্থনৈতিক সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান, দুর্নীতি দমন এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অঙ্গীকার করেছিলেন। শপথ গ্রহণের পর তার বক্তব্যেও বারবার ফিরে এসেছে ‘জনকেন্দ্রিক সরকার’ গঠনের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রকৃত মূল্যায়ন শুরু হয় শপথের পরদিন থেকেই। কথার চেয়ে কাজের প্রমাণই তখন বড় হয়ে ওঠে।
শপথ নেওয়ার পর সচিবালয়ে উপস্থিত থেকে কাজ করছেন প্রধানমন্ত্রী— এই চর্চা প্রশাসনিক অঙ্গনে এক ভিন্ন মাত্রার আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশাসনের ভেতরে কর্মরত বহু কর্মকর্তা এটি অস্বাভাবিক বলেই বর্ণনা করেছেন, কারণ অতীতে এমন দৃশ্য সচরাচর দেখা যায়নি।
সম্প্রতি ডেইলি স্টারের সাংবাদিক বাহরাম খান তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্রে প্রায় এক যুগ কাজ করার অভিজ্ঞতায় শপথের পর টানা চারদিন প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ে কাজ করার নজির তার মনে পড়ছে না। ১ নম্বর ভবন ঘিরে মন্ত্রী ও সচিবদের দৌড়ঝাঁপ, বৈঠকের ব্যস্ততা এবং সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়ার তৎপরতা— সব মিলিয়ে এক নতুন কর্মগতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তার পর্যবেক্ষণে ছিল সতর্ক আশাবাদ— ‘দেখা যাক কতদিন কন্টিনিউ হয়… যদি এই গতি থাকে, তাহলে ভবিষ্যতই কথা বলবে।’
এই মন্তব্যে যেমন রয়েছে প্রত্যাশা, তেমনি অভিজ্ঞতার নির্যাস থেকে আসা সতর্কতা। প্রশাসনিক কর্মতৎপরতা যদি ধারাবাহিক হয়, তবেই তা রাজনৈতিক সংস্কৃতির রূপান্তরে অবদান রাখবে।
মন্ত্রিসভা: সাফল্যের পরীক্ষাক্ষেত্র
একজন প্রধানমন্ত্রী দিকনির্দেশনা দিতে পারেন, কিন্তু বাস্তবায়নের ভার বহন করে পুরো মন্ত্রিসভা ও প্রশাসনিক কাঠামো। অর্থনৈতিক সংস্কার তখনই সফল হবে, যখন অর্থ মন্ত্রণালয় স্বচ্ছ বাজেট প্রণয়ন ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে সংস্কার তখনই ফলপ্রসূ হবে, যখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো দক্ষতা, সততা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে কাজ করবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একাধিকবার দেখা গেছে— কয়েকজন মন্ত্রীর অনিয়ম বা বিতর্ক পুরো সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে। টেন্ডার অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার— এসব অভিযোগ দ্রুত জনআস্থা নষ্ট করে। ২০২৪ সালের আন্দোলন প্রমাণ করেছে, জনগণ এখন আগের চেয়ে বেশি সচেতন এবং অসন্তোষ প্রকাশে দ্বিধাহীন। অতএব, তারেক রহমানের কর্মতৎপরতা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার সহযাত্রীরা সমানভাবে সততা ও দক্ষতার পরিচয় দেবেন। তাদের উচিত হবে—
নীতিনিষ্ঠ আচরণ বজায় রাখা;
বিতর্ক থেকে দূরে থাকা;
সম্পদের স্বচ্ছ হিসাব নিশ্চিত করা, এবং
দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তে সহযোগিতা করা।
পরিবর্তনের প্রকৃত মানে
গুণগত পরিবর্তন মানে কেবল অবকাঠামো নির্মাণ বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি নয়। এটি রাজনৈতিক আচরণের রূপান্তর, বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা এবং আইনের শাসনের প্রতি অটল অঙ্গীকারের মধ্যেই নিহিত। সংসদ কার্যকর হওয়া, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা— এসবই হবে নতুন সরকারের সাফল্যের সূচক।
প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়মুখী উপস্থিতি একটি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে— সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে কাজ শুরু করেছে। কিন্তু সেই বার্তা টেকসই হবে কিনা, তা নির্ভর করবে ধারাবাহিকতার ওপর। বাহরাম খানের পর্যবেক্ষণ তাই শুধু প্রশংসা নয়; এটি এক ধরনের সময়সীমা নির্ধারণও— গতি যদি থাকে, ভবিষ্যৎ কথা বলবে।
সময়ের কঠিন পরীক্ষা
বাংলাদেশ আজ প্রত্যাশা ও সম্ভাবনার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে, কিন্তু সেই রায়ের স্থায়িত্ব নির্ভর করছে প্রতিশ্রুতি রক্ষার ওপর। তারেক রহমানের দৃশ্যমান কর্মতৎপরতা একটি আশাব্যঞ্জক সূচনা— তবে এটি কেবল শুরু।
এখন প্রয়োজন দলগত সততা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং নৈতিক মানদণ্ডে আপসহীন অবস্থান। তার সারথীরা যদি ভালো কাজ দিয়ে এই অগ্রযাত্রা শক্তিশালী করেন এবং কোনো বিতর্কে জড়িয়ে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ না করেন, তবে ২০২৬ সত্যিই হতে পারে রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। অন্যথায়, ইতিহাস আবারও কঠোর হবে।
জনগণ অপেক্ষা করছে— কথার নয়, কাজের।
লেখক: ডেপুটি এডিটর, আগামীর সময়

