আগামীর চোখ
অমাবস্যার চাঁদ

বরাবর
মহাপরিচালক, টিকিট গায়েব ও ব্লককরণ শাখা
আমি ডিজিটাল বাংলাদেশের একজন অতিসাধারণ, বোকা ও আঙুল দিয়ে মোবাইল স্ক্রিন ঘষতে ঘষতে ক্লান্ত, পরাজিত এক হতভাগা ‘ডিজিটাল’ রেলযাত্রী। প্রতিদিন সকাল ঠিক ৭টা ৫৯ মিনিটে আমি দুই হাতের দশটা আঙুল এবং ঘরের অতি উচ্চগতির ওয়াইফাই নিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিই। উদ্দেশ্য একটাই— রেলওয়ের সার্ভার থেকে একটি সোনার হরিণ অর্থাৎ একটি এসি স্নিগ্ধা বা শোভন চেয়ারের টিকিট শিকার করা।
কিন্তু প্রতিবারই আমি এক অলৌকিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই। ঘড়ির কাঁটা ঠিক সকাল ৮টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে যখন আমি সার্ভারে প্রবেশ করি, তখন দেখি মাত্র এক সেকেন্ডের ব্যবধানে কয়েক হাজার টিকিট উধাও! স্ক্রিন জুড়ে শুধু ‘বুকড’ অথবা ‘নট অ্যাভেলেবল’। ‘আলোর গতির চেয়েও দ্রুতগতিতে টিকিট ব্লক করার’ যে অতিপ্রাকৃতিক প্রযুক্তি আপনারা আবিষ্কার করেছেন, তা দেখলে সত্যিই বিস্মিত হতে হয়।
আপনারা অত্যন্ত সফলভাবে প্রমাণ করেছেন, টিকিট কাটার জন্য ইন্টারনেট স্পিড বা টাকার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন শুধু যোগাযোগ
আমরা সাধারণ মানুষ ভুল করে ভাবি, টিকিট কাউন্টার বা অনলাইনে বিক্রি হয়। কিন্তু আপনাদের এই অনন্য ব্যবস্থাপনায় আমরা বুঝতে পেরেছি, টিকিট আসলে বিক্রির জন্য নয়; বরং ‘ব্লক’ করে রাখার জন্য তৈরি করা হয়। এভাবে আপনারা দেশের অর্থনীতিতেও কী অভূতপূর্ব অবদান রাখছেন! ৫০০ টাকার টিকিট যদি সাধারণ মানুষ ৫০০ টাকাতেই কিনে ফেলত, তবে দেশের টাকার ঘূর্ণন থমকে যেত। আপনারা সেই টিকিট ব্লক করে, নিজেদের খাতিরের লোকদের হাত ঘুরে যখন ২,০০০ টাকায় সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন, তখন বাজারে টাকার তারল্য বাড়ে। অর্থনীতি সচল রাখার এই গোপন ফর্মুলা নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য।
আপনারা অত্যন্ত সফলভাবে প্রমাণ করেছেন, টিকিট কাটার জন্য ইন্টারনেট স্পিড বা টাকার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন শুধু ‘সঠিক জায়গায় সঠিক যোগাযোগ’। আপনাদের সার্ভারটি যেন একটি গভীর ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো, সাধারণ মানুষ নক করলেই সে ‘সার্ভার ডাউন’ নামের এক পরম শান্তিতে তলিয়ে যায়। অথচ পেছনের দরজা দিয়ে যখন ‘টিকিট ব্লককারী’ দেবদূতরা আসে, তখন সার্ভারটি মাখনের মতো মসৃণভাবে কাজ করে।
অতএব মহোদয়, আপনার কাছে বিনীত প্রার্থনা, আগামীতে টিকিট ছাড়ার এই ভণ্ডামি বা নাটকটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হোক। আপনারা সরাসরি ওয়েবসাইটে লিখে দিন— ‘টিকিট ছাড়ার আগেই ব্লক সম্পন্ন হয়েছে, খামোখা গুঁতাগুঁতি করবেন না।’ এতে আমাদের সকালবেলার রক্তচাপ অন্তত নিয়ন্ত্রণে থাকবে। অথবা টিকিট কাটার অ্যাপের নাম পরিবর্তন করে ‘লটারি অ্যাপ’ রাখতে পারেন। এতে অন্তত টিকিট না পেলে আমাদের আফসোস থাকবে না, মনে করব ভাগ্যে লটারি মেলেনি!
ইতি
‘লগ ইন’ করেই ‘হা-হুতাশ’ করা এক সাধারণ নাগরিক



