বিচিত্রা সাক্ষাৎকার
মুস্তাফা মনোয়ার

বিচিত্রাতে মুস্তাফা মনোয়ারের প্রকাশিত সাক্ষাৎকার
আমাদের দেশের সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, রাজনীতিবিদদের আশ্বাসে, সমাজকর্মীদের প্রচেষ্টায় শিশুদের সার্বিক মঙ্গল বাসনার নানা কথা বলা হলেও আজ পর্যন্ত এদেশে শিশুর সুকুমার বৃত্তির বিকাশের জন্য রাষ্ট্রীয় বা বেসরকারী পর্যায়ে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। বিগত পাঁচ-ছয় বছর ধরে নিরলস প্রচেষ্টায় নিয়োজিত রয়েছেন ঢাকা টেলিভিশনের প্রখ্যাত মুস্তাফা মনোয়ার।
শিশুদের সুকুমার বৃত্তির বিকাশের মানকে শিশু চলচ্চিত্র তৈরীর জন্য চারু ও কারুকলা কলেজের একদল ছাত্রকে নিয়ে মুস্তাফা মনোয়ার শুরু করেছিলেন তার প্রচেষ্টা। সেদিন তার এই মহতী প্রচেষ্টা নানা কারণে বাস্তবায়িত হতে পারেনি। আজ পরিবর্তিত রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় মুস্তাফা মনোয়ার নতুন উদ্যমে শুরু করেছেন কাজ। নতুন করে পর্ষদ গঠিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সহযোগিতার আশ্বাস পেয়েছেন। তাই আমরা গিয়েছিলাম তার পরিকল্পনার বিস্তৃত বিবরণ শুনতে।
বিচিত্রা : প্রথম দিকে আপনারা কিভাবে কাজ শুরু করেছিলেন?
মুস্তাফা মনোয়ার: প্রথমদিকে আমরা মূলতঃ শিশু চলচ্চিত্র নিয়ে পড়শোনায় বেশি ব্যস্ত ছিলাম। সে সময় আমাদের মূল প্রচেষ্টা নিয়োজিত ছিল পুতুল নাচকে কেন্দ্র করে। তারই ফলশ্রুতি হলো ঢাকা টেলিভিশনের পুতুল নাচ (পাপেট শো)। একই সাথে আমরা জীবন্ত অভিনয়ের প্রতিও দৃষ্টি দেই। এবং ভাবতে শুরু করি কিভাবে শিশু চলচ্চিত্র তৈরী করা যায়। সে সময় দু’মিনিট সিকোয়েন্সের একটি শিশু চলচ্চিত্র তৈরী করেছিলেন জনাব কলিম শরাফী। আমাদের দেশে যে কত সহজে এ কাজ সমাধা হতে পারে তা শুনলে আশ্চর্যান্বিত হতে হয়। সেদিন যারা আমাকে সহযোগিতা করেছিলেন তাদের নিয়ে আমি মূলতঃ সেট এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক জিনিস তৈরীর পরিকল্পনা করেছি। তারপর ছাত্রজীবন শেষ করে আমার সাথে সবাই টেলিভিশনে যোগদান করেছে। কিন্তু আমাদের প্রচেষ্টা থেমে যায়নি।
বিচিত্রা: আপনি টিভিতে মূলতঃ কোন অনুষ্ঠানসূচীর উপর গুরুত্ব আরোপ করতেন?
মুস্তাফা মনোয়ার: আমি মূলতঃ শিশুদের অনুষ্ঠান নিয়েই ব্যস্ত থাকতাম। সেই সুযোগে চেষ্টা করেছি শিশু চলচ্চিত্র তৈরী করবার। কিন্তু সেদিন কাউকে বোঝাতে পারিনি। সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছি। শিশুদের জন্য চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাদের আলাদা জগত তৈরী হোক এটা কেউই চাইতো না। এখনো কেউ বুঝতে চায় না যে বাচ্চাদের জন্য আলাদা ছবি তৈরী হোক। (এখানে উল্লেখযোগ্য, মুস্তাফা মনোয়ার যেসময় টেলিভিশনের বাচ্চাদের অনুষ্ঠান প্রযোজনা করতেন, সেসময় সেগুলোর ভূয়সী প্রশংসা হয়েছিল। এবং বাচ্চাদের জন্য মুস্তাফা মনোয়ার প্রযোজিত ছবি ঋতুরঙ্গে আঁকা পশ্চিম জর্মানীতে পাঠানো হয়েছিল।)
বিচিত্র: আপনি টেলিভিশনে যে পাপেট শো’র ব্যবস্থা করেছিলেন তার সম্পর্কে কিছু বলুন।
মুস্তাফা মনোয়ার: আমি যে পাপেট শো’র ব্যবস্থা করেছিলাম তা টেলিভিশনে দীর্ঘ নয় মাস ধরে দেখানো হয়েছে। ‘আজব দেশে’ নাম দিয়ে পাপেট সিরিজের গল্পগুলো চালানো হলেও এবং সে গল্পগুলো আজগুবী বলে মনে হলেও আসলে বোঝাতে চেয়েছি পাকিস্তানী শাসকচক্রের চরিত্রকে। কিন্তু কেউ ধরতে পারেনি।
বিচিত্র: এর পেছনে কি কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল?
মুস্তাফা মনোয়ার: জ্বী।
বিচিত্রা: এর পরবর্তী পর্যায়ে আপনি কি করেন?
মুস্তাফা মনোয়ার: সে সময় আমার জাপান যাবার সৌভাগ্য হয়েছিল। সেখানে আমি পাপেট শো এবং জীবন্ত শিশু চলচ্চিত্র বিশেষভাবে লক্ষ্য করি এবং প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস নিয়ে আসি। পরে টেলিভিশন থেকে আবার চেষ্টা শুরু করি। চেষ্টা করি প্রতিভাবান শিশুদের সমন্বয়ে কিছু করতে। এ সময়ে আমি বাচ্চাদের জন্য যে ‘নিজে কর’ সিরিজটি প্রযোজনা করি। তা টেলিভিশনে দীর্ঘ পঁাচ বছর ধরে দেখানো হয়েছে। একই সাথে আমি চেষ্টা করতে থাকি যাতে সব স্কুলগুলোতে পাপেট শোর আয়োজন করা যায়।
বিচিত্র: পাপেট শো কি ব্যাপক আকারে অনুষ্ঠিত করা সম্ভব?
মুস্তাফা মনোয়ার: জ্বী। ব্যাপক আকারে এর আয়োজন করা সম্ভব। পুতুলের জন্য ছোট্ট সেট প্রয়োজন। এরা এটা বাচ্চারা নিজেরাই তৈরী করতে পারে। এজন্যে তাদের বেগ পেতে হয় না। যেসব গল্প বড়োরা বাচ্চাদের শোনান তা ওরা নিজেরা অভিনয়ের মাধ্যমে রূপ দিতে পারে না। উপরন্তু বাচ্চাদের কাছে পুতুলের আবেদন বেশী। উদাহরণ স্বরূপ, জার্মানীতে যখন শিশু দুর্ঘটনা বেড়ে যায় তখন জার্মান পুলিশের পাপেট টিম বাচ্চাদের দুর্ঘটনা বন্ধ করতে সবচে কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।
বিচিত্রা: পাকহানাদার বাহিনীর আমলে ভারতে অবস্থানকালে এ ব্যাপারে আপনি কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন কি?
মুস্তাফা মনোয়ার: সেসময় কিছু পাপেট সিরিজ তৈরী করা হয়েছিল শিবিরের বাচ্চাদের জন্য। তবে মনে রাখতে হবে বাচ্চাদের জন্য সবচে বড় মিডিয়াম জীবন্ত ছবি। শিশুদের জন্য ছবি তৈরী করতে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের পয়সা দিতে হয় না। বাচ্চারা উৎসাহী হয়ে এতে অংশগ্রহণ করে। আমাদের দেশে ক’জন উৎসাহী লোক পাওয়া গেলে সস্তায় এ ছবি তৈরী করা সম্ভব।
বিচিত্রা: আপনার পুরো পরিকল্পনা কি?
মুস্তাফা মনোয়ার: আনন্দদানের মাধ্যমে শিক্ষা। কিন্তু সিলেবাস পড়ানো নয়। বাচ্চাদের মনকে বিকশিত করতে হবে। তাদের সাংস্কৃতিক চেতনায়, ব্যক্তিগত অনুভূতি তথা তাদের প্রতিভার সার্বিক বিকাশের জন্য চেষ্টা করা। বাচ্চাদের নিয়ে ছবি তৈরী করে আবার তাদের সে ছবি দেখান। বিভিন্ন দেশ থেকেও শিশু চলচ্চিত্র আনার ব্যবস্থা করা। কিন্তু এর পেছনে কোন ব্যবসায়ী মনোবৃত্তি নেই।
বিচিত্রা: আপনি কি মনে করেন আপনার প্রচেষ্টায় আপনি সফল হবেন?
মুস্তাফা মনোয়ার: যেদিন আমি জানতে পেরেছি যে প্রাথমিক পর্যায়ে মাত্র চল্লিশ ডলারের সাহায্যে ওয়াল্ট ডিজনী তার কাজ শুরু করে আজকের ডিজনীল্যান্ড তৈরী করেছেন। সেদিন থেকে আমারও এই বিশ্বাস জন্মেছে যে আমি পারব।
বিচিত্রা: আপনি বর্তমানে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কিসের অভাব অনুভব করেছেন?
মুস্তাফা মনোয়ার: সবচে দরকার সৃজনশীল লোকের। প্রয়োজনে আমি টেলিভিশনের চাকুরী ছেড়ে দিতে রাজী আছি। আমরা এজন্য যে কমিটি দাঁড় করিয়েছি এখনো তার পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে পারিনি। এ ছাড়া রয়েছে অর্থনৈতিক সংকট। এ দেশের লোক এসব ব্যাপারে সবচে কম উৎসাহী। অবশ্যি আমরা রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে সাহায্য ও সহযোগিতার আশ্বাস পেয়েছি। আমি চাই সারা দেশের সচেতন মানুষ এ ব্যাপারে এগিয়ে আসুক। উপলব্ধি করুক শিশু চলচ্চিত্রের গুরুত্ব। অনেক বাবা-মা বড়োদের ছবি দেখার জন্য বাচ্চাদের সাথে নিয়ে যান। এটা ঠিক নয়। বাচ্চারা এসব ছবি দেখে কোন আনন্দ পায় না। মোটকথা বাচ্চাদের জন্য একটা নিজস্ব জগত গড়ে তুলতে হবে। যার মাধ্যমে বাচ্চারা আগামী দিনে সুনাগরিক হতে পারে। (ঈষৎ সংক্ষেপিত)




