সাক্ষাৎকার
বিদ্যুৎ-জ্বালানিতে কোনো গোপন চুক্তি নয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে ব্যয় বৃদ্ধি, ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি, খেলাপি ঋণের চাপসহ নানা অনিশ্চয়তায় আগামী অর্থবছরের বাজেট করছে সরকার। এমন প্রতিকূলতায়ও উচ্চাভিলাষী ব্যয়ের পথে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে কোনো গোপন চুক্তি করা হবে না। সম্প্রতি সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিজনেস এডিটর মিজান চৌধুরী
আগামীর সময়: দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আপনি কীভাবে দেখছেন?
অর্থমন্ত্রী: আগের (আওয়ামী লীগ) সরকারের রেখে যাওয়া এমন একটি অর্থনীতি আমরা পেয়েছি, যেখানে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা জমে আছে। এর ওপর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নতুন চাপ তৈরি করেছে। ফলে আমরা একটি অত্যন্ত কঠিন অর্থনৈতিক সময় অতিক্রম করছি। সামনে অন্তত আরও দুই বছর কঠিন সময় যেতে পারে। এ অবস্থা থেকে বের হতে কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে, যেগুলো হয়তো সবসময় জনপ্রিয় হবে না। কিন্তু এরপরও সেগুলো মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। বর্তমানে দেশের খেলাপি ঋণের অঙ্ক ৩০ শতাংশেরও বেশি। কোনো অর্থনীতিতে যখন খেলাপি ঋণ এভাবে বেড়ে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই অর্থনৈতিক গতি কমে আসে। ২০০৫ সালে খেলাপি ঋণের হার ছিল প্রায় ১৩ শতাংশ।
আগামীর সময়: এমন পরিস্থিতিতে কেন বড় বাজেট দিতে যাচ্ছেন?
অর্থমন্ত্রী: অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে হলে বিনিয়োগ ও ব্যয় বাড়াতে হবে। অর্থনীতি এখন যে অবস্থায় আছে, সেখান থেকে ওপরের দিকে তুলতে না পারলে স্থবিরতা আরও বাড়বে। বড় বাজেট ছাড়া দারিদ্র্য বিমোচন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান তৈরি সম্ভব নয়। উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে দিলে জিডিপি প্রবৃদ্ধিও কমে যাবে।
আগামীর সময়: কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ আছে। সরকার কীভাবে বিষয়টি দেখছে?
অর্থমন্ত্রী: কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এটি খুব সহজ নয়। ব্যবসায়ীরা এমনিতেই কঠিন সময় পার করছেন। তবে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ এবং অভ্যন্তরীণ বাজার শক্তিশালীকরণ করব। এতে উৎপাদন, কর্মসংস্থান, আয় ও ভোগ বাড়বে। সেই সম্প্রসারিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকেই কর রাজস্ব টেকসইভাবে বাড়বে। একই সঙ্গে কর ছাড় ও প্রণোদনাকে বাস্তব বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করে রাজস্ব ক্ষয়রোধের উদ্যোগে নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সম্পত্তি ও সম্পদমূল্য যে বাড়ছে, সেটি আধুনিক সম্পত্তি করের আওতায় আনা হবে। উৎপাদন ও বিনিয়োগ থেকে সৃষ্ট সম্পদও রাষ্ট্রীয় আয়ে প্রতিফলিত করা হবে। এ ছাড়া আসন্ন বাজেটে ডিজিটাল লেনদেন, ব্যাংক হিসাব ও সম্পত্তির তথ্য ব্যবহার করে উচ্চ আয়ের ব্যক্তি ও ব্যবসাকে করের আওতায় আনা হবে, যাতে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির সুফল রাষ্ট্রীয় কোষাগারে প্রতিফলিত হয়।
আগামীর সময়: ব্যবসায়ীরা কি আগামী বাজেটে বিশেষ সুবিধা পাবেন?
অর্থমন্ত্রী: বর্তমান বাস্তবতায় ব্যবসায়ীদের সব দাবি পূরণ করা সম্ভব নাও হতে পারে। কারণ, সরকারেরও সীমাবদ্ধতা আছে। তবে ব্যবসা পরিচালনার পথে যেসব বাধা রয়েছে, সেগুলো দূর করতে চাই। বিশেষ করে বিনিয়োগের পরিবেশকে বিনিয়ন্ত্রিতকরণ করে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার পরিকল্পনা আছে। বাজার ব্যবস্থাপনাকে সিন্ডিকেটমুক্ত এবং লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমিয়ে প্রকৃত ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা হবে। বৈদেশিক বাণিজ্য এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র, অর্থনৈতিক জোট ও অঞ্চলের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয়, বহুপক্ষীয় এবং মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) গঠনে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শুল্ক হ্রাস, অশুল্ক বাধা কমানো, বাজার প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ সহযোগিতা জোরদারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে যাতে রপ্তানি বৈচিত্র্য বাড়ে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসইভাবে এগিয়ে যায়। আমরা তৈরি পোশাকের বাইরেও দেশীয় হস্তশিল্প, গৃহসজ্জা, পাটপণ্য, প্রাকৃতিক প্রসাধনী, খেলনা ও শিশুপণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিত করানোর উদ্যোগ গ্রহণ করব। আর অনলাইনভিত্তিক জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন ই-বে
কিংবা আলীবাবার মতো বিশ্বখ্যাত ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের চাহিদা অনুযায়ী দেশের ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্পের উৎপাদন বাড়ানো হবে। প্রয়োজনে লজিস্টিকস হাব প্রতিষ্ঠা করা হবে। এর মাধ্যমে বন্দর অবকাঠামোর আধুনিকায়ন, গভীর সমুদ্রবন্দর সক্ষমতা বৃদ্ধি, মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট নেটওয়ার্ক (সমুদ্র-সড়ক-রেল-নদীপথ) একীভূতকরণ এবং ডিজিটাল কাস্টমস ও ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন জোরদার করা হবে। একই সঙ্গে আধুনিক ওয়ারহাউজিং ও ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টার সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে সাপ্লাই চেইনের দক্ষতা নিশ্চিত করা হবে।
আগামীর সময়: বাণিজ্য সম্প্রসারণের কথা বলছেন, তবে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে আপনার পরিকল্পনা কী?
অর্থমন্ত্রী: বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বাণিজ্যনীতি পুনর্গঠন করে কাঁচামালের শুল্ক কাঠামো যৌক্তিকীকরণ, অগ্রাধিকারমূলক (প্রেফারেনশিয়াল) চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা হবে। আঞ্চলিক সহযোগিতা পেতে বিমসটেক, আসিয়ান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে নতুন বাজার-সুবিধা ও বিভিন্ন খাতে প্রেফারেনশিয়াল চুক্তি সম্পাদনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আগামীর সময়: এসএমই ও ক্রিয়েটিভ ইকোনমিকে কেন গুরুত্ব দিচ্ছেন?
অর্থমন্ত্রী: সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থান তৈরি হয় এসএমই খাতে। একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা যদি ৩০০ টাকার পণ্য ১০০০ টাকায় বিক্রি করতে পারেন, তাহলে সেখানে আয়, কর্মসংস্থান ও রপ্তানির সবই বাড়বে। আমরা ডিজাইন, মার্কেটিং, অনলাইন বাণিজ্য ও দক্ষতা উন্নয়নে সহায়তা দিতে চাই। একই সঙ্গে আমরা ক্রিয়েটিভ ইকোনমিকেও গুরুত্ব দিচ্ছি। স্পোর্টস, সিনেমা, সংগীত, থিয়েটার, সংস্কৃতি এসবও অর্থনীতির অংশ। একটি দেশের সফট পাওয়ার গড়ে ওঠে তার সংস্কৃতি ও সৃজনশীল শিল্পের মাধ্যমে। বাংলাদেশেও সেই সম্ভাবনা রয়েছে।
উচ্চ আয়ের ব্যক্তি ও ব্যবসাকে করের আওতায় আনতে ডিজিটাল লেনদেন, ব্যাংক হিসাব ও সম্পত্তির তথ্য ব্যবহার করা হবে
সম্পদ বৃদ্ধিকে কর ভিত্তিতে আনতে চালু হচ্ছে ‘আধুনিক সম্পত্তি কর ব্যবস্থা’
‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করে অর্থনীতির সুফল পৌঁছানো হবে সাধারণ মানুষের কাছে
আগামীর সময়: কর্মসংস্থান নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
অর্থমন্ত্রী: দেশে ‘এক গ্রাম এক পণ্য’ কর্মসূচি চালু করা হবে, যেখানে প্রতিটি গ্রাম তার নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পণ্য যেমন সোনারগাঁর জামদানি, টাঙ্গাইলের শাড়ি, রাজশাহীর সিল্ক, রংপুরের শতরঞ্জি, ঝালকাঠির শীতলপাটি ইত্যাদিকে উৎপাদন কেন্দ্রে রূপান্তর করা হবে। সরকার এ উদ্যোগে নকশা সহায়তা, অর্ডারভিত্তিক ঋণ ও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ই-বাজার সংযোগ দেবে। এর মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান হবে। নারীদের নেতৃত্বে প্রতিটি হস্তশিল্প উদ্যোক্তাকে একত্র করে গ্রামীণ ও শহরভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ গড়ে তোলার চিন্তা আছে। ‘কমন ফ্যাসিলিটি সেন্টার’, গুণগত মান সনদ ও ডিজিটাল বাজার সংযোগের মাধ্যমে ন্যায্য দাম ও রপ্তানি বাজারে অধিকার নিশ্চিত করা হবে। ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পে টার্গেটেড সাপোর্ট কর্মসূচির আওতায় উদ্যোক্তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ সহায়তা ছাড়াও রপ্তানি, ডিজাইনিং, ব্র্যান্ডিং এবং দেশি-বিদেশি মার্কেটপ্লেসে বিক্রয়ের জন্য বিক্রয় প্ল্যাটফর্ম সহায়তা প্রদান করা হবে।
আগামীর সময়: জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা কী?
অর্থমন্ত্রী: খাদ্য নিরাপত্তার মতো জ্বালানি নিরাপত্তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রে আরও অনুসন্ধান হোক। এতদিন আমদানিনির্ভর জ্বালানির দিকে বেশি ঝোঁক ছিল। এখন আমরা দেশীয় উৎস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিচ্ছি। নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে জলবিদ্যুৎ নিয়ে আলোচনা চলছে। জ্বালানি মিশ্রণে ভারসাম্য আনতে কাজ করছি। তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ক্রয়ে কোনো গোপন চুক্তি করা হবে না। বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি জাতীয় স্বার্থ, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও যৌক্তিক রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে পুনর্বিন্যাস করা হবে। চট্টগ্রাম বা উপকূলীয় শিল্পাঞ্চলে ধাপে ধাপে ৫০ লাখ টন পরিশোধন সক্ষমতাসম্পন্ন নতুন ক্রুড অয়েল রিফাইনারি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও কূপ খননে বাপেক্সকে শক্তিশালী করে স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামো নিশ্চিতে নেওয়া হবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। জ্বালানির দাম সাশ্রয়ী ও স্বচ্ছ রাখতে ট্যারিফ নির্ধারণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা জোরদার করা হচ্ছে। গৃহস্থালি ও শিল্প খাতে গ্যাসের ন্যায্য, নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিতরণ কাঠামো ও মূল্যনীতি পর্যালোচনা হবে।
আগামীর সময়: আগামী বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা কী?
অর্থমন্ত্রী: আমরা চাই অর্থনীতির সুফল যেন সবার কাছে পৌঁছায়। এজন্য তৈরি করা হবে একটি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’। এর মধ্য দিয়ে যারা এতদিন অর্থনীতির মূলধারার বাইরে ছিল অর্থাৎ গ্রামের মানুষ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, নারী, কৃষকসহ সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হবেন।
ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে এরই মধ্যে অনেক পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সেখানে পরিবারের নারী সদস্যকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে নারীর ক্ষমতায়নও হয়। আমরা কৃষকদের বাদ দিতে চাই না। কৃষকের সার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত সব জায়গায় তাকে সহায়তা দিতে হবে। নইলে সামগ্রিক উন্নয়নের মধ্যেও কৃষক বঞ্চিত থেকে যাবে।
আগামীর সময়: সরকারি সম্পদ সিকিউরিটাইজ করার পরিকল্পনা নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। বিষয়টি কী?
অর্থমন্ত্রী: সরকারি সম্পদ সরাসরি বিক্রি করার কথা বলা হচ্ছে না। আমরা ভাবছি ভবিষ্যৎ আয়ের বিপরীতে সিকিউরিটি ইস্যু করা যায় কি না। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা অর্থ দেবেন এবং সরকার সেই অর্থ উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহার করতে পারবে। পরে এ সিকিউরিটিগুলো ক্যাপিটাল মার্কেটে লেনদেন করা যাবে। ভারতে এ ব্যবস্থা পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে। আমরাও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি।
আগামীর সময়: আপনি ভবিষ্যৎ অর্থনীতিকে কোথায় দেখতে চান?
অর্থমন্ত্রী: আমরা এমন একটি অর্থনীতি চাই, যেখানে শুধু প্রবৃদ্ধি নয় সুযোগের গণতন্ত্র থাকবে। অর্থনীতির সুফল যেন শুধু একটি গোষ্ঠীর হাতে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং সাধারণ মানুষও অংশ নিতে পারে, সেই লক্ষ্যেই কাজ করছি। এটি সহজ পথ নয়। সামনে চ্যালেঞ্জ আছে। কিন্তু বিশ্বাস করি, সঠিক নীতি, আর্থিক শৃঙ্খলা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ আবারও স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে পারবে। ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার হবে। সম্পদ ও সুযোগকে একচেটিয়া করে রাখা অলিগার্কি (গোষ্ঠীশাসন) কাঠামো ভেঙে অর্থনৈতির গণতন্ত্রায়ন হবে— যেখানে অর্থনীতি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, অংশগ্রহণমূলক এবং সবার জন্য উন্মুক্ত। আমাদের লক্ষ্য বাংলাদেশকে একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক, উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর করা, যেখানে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে।
বিনিয়োগের পরিবেশকে বিনিয়ন্ত্রিতকরণ করে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার পরিকল্পনা
বাজেটে গুরুত্ব পাচ্ছে ক্রিয়েটিভ ইকোনমি
শেয়ারবাজার উন্নয়নে বিদেশি ফান্ড ম্যানেজার ও বড় বিনিয়োগকারীদের দেশে আনতে কাজ চলছে
বিনিয়োগকারীদের জন্য ‘ফরেন পোর্টফলিও ইনভেস্টমেন্ট (এফপিআই)’ অনবোর্ডিং পোর্টাল চালু
কর্মসংস্থানে চালু হবে ‘এক গ্রাম এক পণ্য’ কর্মসূচি
আগামীর সময়: আসন্ন বাজেটে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতকে কেন এত গুরুত্ব দিচ্ছেন?
অর্থমন্ত্রী: কারণ, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড (জনসংখ্যাগত লভ্যাংশ) পেতে হলে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। আমরা গত এক দশকে অনেক মূল্যবান সময় হারিয়েছি। এখনো যে সুযোগ আছে, সেটি কাজে লাগাতে হবে। আমি সবসময় বলি একজন মানুষ যদি মাসে ৫ হাজার টাকা স্বাস্থ্য খাতে সাশ্রয় করতে পারেন, তাহলে সেটি তার জীবনের মানোন্নয়নে কাজে লাগবে। এটিও এক ধরনের পরোক্ষ ক্যাশ ট্রান্সফার। শিক্ষার ক্ষেত্রেও আমরা পরিবর্তন আনতে চাই। বাজার চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে।
আগামীর সময়: তাহলে কি সরকার ভোকেশনাল শিক্ষার দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে?
অর্থমন্ত্রী: অবশ্যই। বর্তমানে প্রায় সব শিক্ষার্থী প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে। অথচ কর্মসংস্থানের বড় অংশ তৈরি হচ্ছে দক্ষতাভিত্তিক খাতে। আমরা চাই, স্কুলপর্যায় থেকেই স্কিল ডেভেলপমেন্ট শুরু হোক। কেউ ইলেকট্রিশিয়ান হবে, কেউ টেকনিশিয়ান এসব পেশাকেও মর্যাদার জায়গায় আনতে হবে। আমাদের অনেক মানুষ বিদেশে গিয়ে মাসে ৫০০ ডলার আয় করেন। কিন্তু দক্ষতা বাড়াতে পারলে তারা ২০০০ ডলার আয় করতে পারবেন। তাহলে রেমিট্যান্সও বহুগুণ বাড়বে।
আগামীর সময়: ক্যাপিটাল মার্কেট নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা কী?
অর্থমন্ত্রী: ক্যাপিটাল মার্কেটে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে ভালো কোম্পানিগুলো বাজারে আসতে চায়নি। কারণ, বাজারে আস্থার সংকট ছিল। আমরা চাই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাক। বিদেশি ফান্ড ম্যানেজার ও বড় বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আনতে কাজ চলছে। শুধু ব্যাংকনির্ভর অর্থনীতি টেকসই নয়। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য শক্তিশালী ক্যাপিটাল মার্কেট দরকার। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি করে একটি স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারির আওতায় আনা হবে। পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন গঠন করে গত ১৫ বছরে পুঁজিবাজারে সংঘটিত অনিয়ম তদন্তে একটি বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠন, অনিয়ম ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করব। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগবান্ধব ও যুক্তিসংগত করনীতি প্রণয়ন এবং পুঁজিবাজারে সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করা হবে। আমাদের লক্ষ্য হলো— বিনিয়োগের গণতন্ত্রীকরণ ও ‘সবার জন্য সম্পদ সৃষ্টির সুযোগ’ করা। প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এনআরবি ইনভেস্টমেন্ট গেটওয়ে চালু, পুঁজিবাজারে ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ‘ফরেন পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট (এফপিআই)’ অনবোর্ডিং পোর্টাল চালু, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সংশ্লিষ্ট বিধান সমন্বয় করা হবে, যাতে বৈদেশিক মূলধন আকর্ষণ বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশের সব জায়গা থেকে মার্কেট
প্রবেশাধিকারকে সহজলভ্য করা হবে। স্টার্টআপ ও এসএমই খাতের জন্য ‘ডিজিটাল আইপিও এক্সপ্রেস’ ব্যবস্থা চালু করা হবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় একটি দ্রুত কার্যকর ‘পুঁজিবাজার ট্রাইব্যুনাল’ গঠন এবং হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা ও বিনিয়োগকারী অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা প্রবর্তন করার জন্য
কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যক্তিগত অর্থব্যবস্থা ও পুঁজিবাজার শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা আছে।







