সাক্ষাৎকার
ভর্তুকির চাপ কমাতে রোডম্যাপ দরকার

এম মাসরুর রিয়াজ
কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতা সামনে রেখে আগামী ১১ জুন ঘোষিত হবে আগামী অর্থবছরের বাজেট। যেখানে সরকারকে একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, স্থবির কর্মসংস্থান এবং জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করতে হবে। পাশাপাশি ভর্তুকির চাপ সামলাতে হবে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাজেটের অগ্রাধিকার ও নীতিগত করণীয় নিয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. এম মাসরুর রিয়াজ। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি নুরুজ্জামান তানিম।
আগামীর সময়: আগামী বাজেটে কী কী অগ্রাধিকার থাকতে পারে?
মাশরুর রিয়াজ: সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। প্রায় আড়াই বছর ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে, যা জনজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দ্বিতীয় অগ্রাধিকার কর্মসংস্থান। বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রায় স্থবির। তৃতীয়ত, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি, অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
আগামীর সময়: শেয়ারবাজারের উন্নয়নে কী পদক্ষেপ প্রয়োজন?
মাশরুর রিয়াজ: পুঁজিবাজারকে শুধু শেয়ার কেনাবেচার ক্ষেত্র হিসেবে নয়, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কর কাঠামো সহজ ও বিনিয়োগবান্ধব করা, বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রণোদনা বাড়ানো এবং বন্ড মার্কেট উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি রেগুলেটরি সংস্কারও জরুরি।
আগামীর সময়: আসন্ন বাজেটের প্রধান চ্যালেঞ্জ কী?
মাশরুর রিয়াজ: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে উন্নয়ন ব্যয় ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। অতিরিক্ত ব্যয় মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে, আবার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাবে। একই সঙ্গে দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে রাজস্ব আহরণও চাপে থাকবে।
আগামীর সময়: আইএমএফের ভর্তুকি কমানোর চাপকে কীভাবে দেখছেন?
মাশরুর রিয়াজ: বাংলাদেশের জন্য আইএমএফ কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সব ভর্তুকি একসঙ্গে তুলে নেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে ভর্তুকি কমানোর একটি গ্রহণযোগ্য রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।
আগামীর সময়: রাজস্ব আহরণের পরিধি বাড়ানো কতটা বাস্তবসম্মত?
মাশরুর রিয়াজ: বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের নতুন কর আরোপ খুব বাস্তবসম্মত নয়। তবে কর প্রশাসন সহজ করা, কর ফাঁকি কমানো এবং দীর্ঘদিনের কর অব্যাহতি ধীরে ধীরে প্রত্যাহারের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব।
আগামীর সময়: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কী করতে পারে?
মাশরুর রিয়াজ: উচ্চ সুদহার ও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজারে অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি সহজ করা গেলে উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়বে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে।
আগামীর সময়: অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে বড় বাজেট কতটা যৌক্তিক?
মাশরুর রিয়াজ: অপ্রয়োজনীয়ভাবে বড় বাজেট করলে মূল্যস্ফীতি ও ঘাটতির চাপ বাড়বে। তবে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় পরিচালন ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধন জরুরি।
আগামীর সময়: পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলছে?
মাশরুর রিয়াজ: পরিচালন ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। বিদ্যুৎ খাতে অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকি, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে লিকেজ এবং লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ব্যয় কমাতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় আকারে বেতন বৃদ্ধি আর্থিক চাপ আরও বাড়াতে পারে।
আগামীর সময়: শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয়ে আপনার মত কী?
মাশরুর রিয়াজ: শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। দক্ষ মানবসম্পদ গঠন ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য এই দুই খাতে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
আগামীর সময়: ঋণ পরিশোধের চাপ ও বিনিয়োগ সংকট মোকাবিলায় কী করণীয়?
মাশরুর রিয়াজ: ঋণ নিতে হবে সতর্কতার সঙ্গে এবং শুধু উচ্চ অর্থনৈতিক রিটার্ন পাওয়া যায় এমন প্রকল্পে। পাশাপাশি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান উভয়ই বাড়বে।




