ঋণের ৩০% এমএসএমই খাতে বিনিয়োগ করবে এনসিসি ব্যাংক

এনসিসি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকির আনাম
এসএমই খাতের ঋণ ঝুঁকিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন এনসিসি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকির আনাম
প্রশ্ন: এনসিসি ব্যাংকের মোট ঋণ পোর্টফোলিওতে এসএমই ঋণের অংশ বর্তমানে কত? আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরে লক্ষ্য কী?
উত্তর: বর্তমানে এনসিসি (ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স) ব্যাংকের মোট ঋণের প্রায় ২৪ শতাংশই এমএসএমই খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে এই হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে ব্যাংকটি। এটি জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির প্রতি আমাদের ব্যাংকের অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
প্রশ্ন: এসএমই ঋণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি কোথায় দেখেন?
উত্তর: এসএমই ঋণে প্রধান ঝুঁকি হলো তথ্যের স্বচ্ছতার অভাব এবং ব্যবসার আকারের তুলনায় সীমিত আর্থিক সক্ষমতা। অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এখনো নিয়মিত হিসাব সংরক্ষণ করেন না। ফলে তাদের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা মূল্যায়ন করা কঠিন হয়। এ ছাড়া বাজারের ওঠানামা, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক বা অর্থনৈতিক ঝুঁকিও এসএমই ব্যবসাকে বেশি প্রভাবিত করে।
প্রশ্ন: দেশে এসএমই খাতের সবচেয়ে বড় তিনটি চ্যালেঞ্জ কী?
উত্তর: আমার দৃষ্টিতে দেশের এসএমই খাতের সবচেয়ে বড় তিনটি চ্যালেঞ্জ হলো অর্থায়নে সহজ প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করা। অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক সম্ভাবনা থাকলেও পর্যাপ্ত মূলধন, আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবলের অভাবে তারা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেন না। প্রশ্ন: অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এখনো আনুষ্ঠানিক ব্যাংক ব্যবস্থার বাইরে। তাদের জন্য কী করা উচিত?
উত্তর: ব্যাংক সেবাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহজলভ্য করতে হবে। আমি মনে করি, এজেন্ট ব্যাংকিং, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট ওপেনিং এবং বিকল্প তথ্যভিত্তিক ঋণ মূল্যায়ন ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদের আর্থিক সাক্ষরতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসার তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণের বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। ব্যাংক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রশ্ন: খেলাপি ঋণের আশঙ্কায় অনেক ব্যাংক এসএমই ঋণে সতর্ক থাকে। এতে কি প্রকৃত উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন?
উত্তর: কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃত উদ্যোক্তারা অর্থায়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন, তবে ব্যাংকের জন্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত ঝুঁকি এড়িয়ে যাওয়া নয়, বরং ঝুঁকি সঠিকভাবে মূল্যায়ন ও ব্যবস্থাপনা করা। প্রযুক্তিনির্ভর ক্রেডিট স্কোরিং, বিকল্প ডেটা ব্যবহার এবং ক্রেডিট গ্যারান্টি সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের সুযোগ আরও বাড়ানো সম্ভব।
প্রশ্ন: এখনো অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা জামানতের অভাবে ঋণ পান না। এ সমস্যা সমাধানে কী করা দরকার?
উত্তর: দেশে এসএমই অর্থায়নের অন্যতম আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো জামানতের সীমাবদ্ধতা। অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক দক্ষতা ও বাজার সম্ভাবনা থাকলেও পর্যাপ্ত সম্পদ না থাকায় তারা ব্যাংকঋণ থেকে বঞ্চিত হন। এ সমস্যা সমাধানে জামানতনির্ভর ঋণ মূল্যায়নের পাশাপাশি ক্যাশ-ফ্লো, ব্যবসার লেনদেনের ইতিহাস এবং ডিজিটাল তথ্যভিত্তিক মূল্যায়নকে গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রশ্ন: এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সুদ সুবিধা প্রয়োজন বলে মনে করেন?
উত্তর: বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে এমএসএমই খাতের জন্য বিভিন্ন রিফাইন্যান্স, প্রিফাইন্যান্স এবং ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম চালু করেছে, যা উদ্যোক্তাদের অর্থায়নপ্রাপ্তি সহজতর করেছে এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ খাতে আরও বেশি মনোযোগী হতে উৎসাহিত করছে।
প্রশ্ন: ডিজিটাল ডেটা ব্যবহার করে ঋণ অনুমোদন কতটা বাড়ানো সম্ভব?
উত্তর: ডিজিটাল ডেটা ভবিষ্যতের এসএমই অর্থায়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হবে বলে আমি মনে করি। ডিজিটাল ব্যাংকিং, ই-কেওয়াইসি, অনলাইন ঋণ আবেদন, ডিজিটাল পেমেন্ট, কিউআরভিত্তিক লেনদেন এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এসএমই উদ্যোক্তারা দ্রুত, সহজ ও কম খরচে আর্থিক সেবা গ্রহণ করতে পারেন।
প্রশ্ন: নারীদের জন্য জামানতবিহীন ঋণ বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে কি?
উত্তর: নারী উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন নীতিগত সহায়তা এবং পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা এরই মধ্যে এক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। ভবিষ্যতে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আরও সহজ শর্তে ঋণ, ব্যবসায়িক পরামর্শ এবং বাজার সংযোগের সুযোগ বৃদ্ধি করা হলে তাদের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে।
প্রশ্ন: নারী উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় বাধা কোথায়?
উত্তর: নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি বাজারে প্রবেশ, ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক তৈরি এবং অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক প্রতিবন্ধকতাও বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক নারী উদ্যোক্তা দক্ষতা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত সহায়তা পান না। তাই অর্থায়নের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, পরামর্শসেবা এবং বাজার সংযোগ নিশ্চিত করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন: আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের এসএমই খাতের সবচেয়ে বড় সুযোগ কোথায়?
উত্তর: আগামী পাঁচ বছরে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, ই-কমার্স, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাতে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী, ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সংযোগ এবং আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ এই খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। প্রশ্ন: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল অর্থনীতি এসএমই অর্থায়নকে কীভাবে বদলে দেবে?
উত্তর: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ঋণ মূল্যায়ন, ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং গ্রাহকসেবাকে আরও দ্রুত ও নির্ভুল করে তুলবে। অন্যদিকে ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসারের ফলে উদ্যোক্তাদের লেনদেনের একটি নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল ইতিহাস তৈরি হবে, যা ঋণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এর ফলে ঋণ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ, দ্রুত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে। আমি মনে করি, আগামী কয়েক বছরে এআইনির্ভর এবং ডেটাচালিত অর্থায়ন ব্যবস্থা এসএমই ব্যাংকিংয়ের চেহারা উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে দেবে।




