পরিচয়বাদী রাজনীতিতে বিপন্ন কেরালার সামাজিক ঐক্য

শশী থারুর
নব্বইয়ের দশকে আমি বিশ্বাস করতাম, ভারত ধীরে ধীরে পরিচয়ের রাজনীতি থেকে কর্মদক্ষতার রাজনীতির দিকে ঝুঁকছে। আমার মনে হয়েছিল, ভোটাররা এখন যথেষ্ট পরিণত। তারা ‘আমরা কে’ তা দেখে নয়, বরং ‘সরকার কী কাজ করেছে’ তা দেখে ভোট দেবে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশ জুড়ে আবার পরিচয়ের রাজনীতির রমরমা শুরু হয়েছে। কেরালার মতো প্রগতিশীল রাজ্যেও গত নির্বাচনী প্রচারের সময় আমি এই একই প্রবণতা লক্ষ করেছি।
কেরালা বরাবরই কাজের নিরিখে রাজনীতি করার জন্য পরিচিত ছিল। উচ্চ সাক্ষরতার হার, শক্তিশালী জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থা এবং বাম ও গণতান্ত্রিক জোটের পালাবদল- সব মিলিয়ে ছিল দেশের অন্যান্য রাজ্যের চেয়ে আলাদা। সেখানে জাতপাত বা ধর্মের চেয়ে শাসনব্যবস্থা এবং সামাজিক উন্নয়ন বেশি গুরুত্ব পেত। কিন্তু সেই গৌরব এখন ফিকে হয়ে আসছে। কেরালাও এখন ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা গোষ্ঠীভিত্তিক ভোটের রাজনীতির কবলে পড়ছে।
কেরালার এই বদলটি সূক্ষ্ম হলেও বেশ স্পষ্ট। প্রচারের ভাষায় এখন সরাসরি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ভোট টানার চেষ্টা চলছে। উত্তর কেরালায় হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণের খেলা চলছে। আবার মধ্য কেরালায় খ্রিস্টানদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, কংগ্রেস জিতলে মুসলিমদের আধিপত্য বাড়বে। প্রার্থীদের যোগ্যতার চেয়েও এখন বেশি দেখা হচ্ছে তারা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা গরিব মানুষের উন্নয়নের বদলে এখন ধর্মীয় ও জাতিগত স্বার্থ বড় হয়ে উঠেছে।
কেরালার এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে বেশকিছু বড় কারণ রয়েছে। জাতীয় স্তরে বিজেপির উত্থান এবং হিন্দুত্বের রাজনীতি কেরালার চিরাচরিত সমীকরণ বদলে দিয়েছে। বিজেপিকে রুখতে বাম ও গণতান্ত্রিক জোটও এখন নিজেদের সাম্প্রদায়িক সময়ের ভোটব্যাংক পোক্ত করতে ব্যস্ত। বেকারত্ব বা মূল্যবৃদ্ধির মতো সমস্যার চেয়ে এখন ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে ভোটারদের একজোট করা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে সহজ উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি ‘খ্রিস্টান-সংঘী’ বা ‘ক্রিসাংঘী’র মতো নতুন শব্দও তৈরি হয়েছে।
এর প্রভাব হবে মারাত্মক। কেরালা তার নিজস্ব সামাজিক সম্প্রীতি এবং প্রগতিশীল ঐতিহ্য হারাতে পারে। যখন রাজনীতি শুধু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর তোষণ বা প্রতীকী প্রতিনিধিত্বের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তখন প্রকৃত উন্নয়ন থমকে যায়। এখন যেকোনো সরকারি নীতিকেও ধর্মীয় চশমা দিয়ে বিচার করা হচ্ছে। কোন শিক্ষা নীতি ভালো কী মন্দ, তার চেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে সেটি কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের স্বার্থে লাগছে।
কেরালার এই পথ চলা আদতে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিরই প্রতিফলন। আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের ফলে যে পরিচয়বাদ মুছে যাওয়ার কথা ছিল, তা আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছে। কেরালা কি তার জনকল্যাণমূলক রাজনীতির ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারবে, নাকি সাম্প্রদায়িক সময়ের উত্তেজনার স্রোতে গা ভাসাবে? উত্তরটা নির্ভর করছে সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর। বিভাজনের রাজনীতি ছেড়ে কেরালাকে আবার সেই পুরনো অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের পথেই ফিরতে হবে। তবেই কেরালা তার স্বতন্ত্র পরিচয় রক্ষা করতে পারবে।
লেখক : লোকসভার এমপি। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনূদিত



