ভারি বৃষ্টি
পানির নিচে চাপা সোনালী স্বপ্ন, দিশেহারা কৃষক

চারদিকে থইথই পানি, তার নিচে চাপা পড়ে আছে সোনালি স্বপ্ন। ছবি : সংগৃহীত
ভারী বৃষ্টির পাশাপাশি উজান থেকে আসা ঢলে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হাওরাঞ্চলে তলিয়ে গেছে বিস্তৃত এলাকার ধানখেত। বাতাসে কাঁপছে না ধানের শীষ, কাঁপছে মানুষের বুক। চারদিকে থইথই পানি, তার নিচে চাপা পড়ে আছে সোনালি স্বপ্ন। কয়েক দিন আগেও যেখানে সোনালি ধান দুলছিল, আজ সেখানে ভাঙা স্বপ্নের নিঃশব্দ চিহ্ন।
গতকাল বুধবার কোমরপানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটছিলেন কয়েকজন শ্রমিক। মাথা থেকে কোমর পর্যন্ত পলিথিনে মোড়া, যেন বৃষ্টির সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকার শেষ চেষ্টা। একটু দূরে দাঁড়িয়ে কাটা ধানের আটি বেঁধে দিচ্ছিলেন কৃষক কামাল মিয়া। চোখের কোণে জমে থাকা পানি আর বৃষ্টির পানির পার্থক্য বোঝা যাচ্ছিল না।
প্রশ্ন করতেই গলা ধরে এলো তার। কান্না কারতে করতে তিনি বলেছেন, ধানের ওপরে তিন-চার হাত পানি। কীভাবে কাটমু? যা ছিল, সব ভেসে গেল। চোখের সামনে তলিয়ে গেল সোনার ধান। ধানই আমাদের জীবন। আর সেই জীবনটাই এখন পানির নিচে ডুবে আছে। আমরা নিঃস্ব হয়ে গেলাম।
এই চিত্র এখন নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মৌলভীবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। টানা বর্ষণে দেশের হাওরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে। যারা জমি থেকে ফসল কাটতে পেরেছেন, তাদের ধানও মাঠে ভিজছে। রোদ না থাকায় শুকিয়ে গোলায় তুলতে পারছেন না কৃষক।
নেত্রকোনা ও কলমাকান্দা
গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় মৌসুমের সর্বোচ্চ ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর সঙ্গে উজানের ঢল মিলিয়ে হাওড় ও নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। ফলে অনেক জায়গায় পাকা ধান পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে, আর যেগুলো কাটা হয়েছে সেগুলোও শুকাতে না পেরে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
খালিয়াজুরী উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, এখন পর্যন্ত হাওড়ের প্রায় ৫৮ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। বাকি ধান এখনো মাঠে রয়েছে, যা পুরোপুরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করছে।
মোহনগঞ্জ উপজেলার গাগলাজুর এলাকার কৃষক মানিক সরকার বলেছেন, সোমবারও জমিতে পাকা ধান ছিল। রাতের বৃষ্টিতে সকালে এসে দেখি সব পানির নিচে। সাত বিঘার মধ্যে মাত্র এক বিঘার ধান তুলতে পেরেছি।
হবিগঞ্জ
বানিয়াচং উপজেলার সুবিদপুর গ্রামের বাসিন্দা এসএম সুরুজ আলী জানান, আর কয়েকদিন থাকলে এসব ধানে পচন ধরতে পারে। কিন্তু ধান কাটার জন্য শ্রমিকও পাচ্ছেন না। কোনো উপায় না পেয়ে তিনি নিজেই বুধবার সকাল থেকে নিজের ছেলেকে নিয়ে ধান কাটতে শুরু করেছেন।
ধানের পাইকারি ব্যবসায়ী হামিদুল হক আখঞ্জী বলেছেন, ধানের সরকারি মূল্য নির্ধারণ না হওয়ায় ধান ক্রয় করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, বেশি দামে যদি ধান ক্রয় করি আর সরকার পরে দাম কমিয়ে নির্ধারণ করে তবে তো লোকসানে বিক্রি করতে হবে। তাই আপাতত পর্যাপ্ত পরিমাণ ধান ক্রয় করতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা।
অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) কৃষিবিদ দীপক কুমার পাল জানান, বুধবার পর্যন্ত জেলায় ২৭১০ হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। আমরা কৃষকদের বলছি দ্রুত ধান কাটতে, কিন্তু বাস্তবতা হলো ধান কেটে তারা কোথায় রাখবে। বৃষ্টির কারণে তো শুকাতে পারবে না। আর না শুকাতে পারলে তো ধান পচে যাবে। তাই ধান কাটায় তাদেরও আগ্রহ কম। তিনি বলেন, পানির কারণে হারভেস্টার মেশিন হাওড়ে নামানো যাচ্ছে না।
মৌলভীবাজার ও বড়লেখা
রাজনগরের কাউয়াদীঘি হাওড়ের অর্ধেকেরও বেশি বোরো ধান তলিয়ে গেছে। কৃষকদের অভিযোগ, কাশিমপুর পাম্প হাউজের গাফিলতি ও সেচ পাম্পগুলো নিয়মিত সচল না রাখায় এমন অবস্থা হয়েছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড বারবার বলে আসছে তারা নিয়মিত সেচ দিচ্ছে।
এদিকে শ্রমিক সংকট, বৃষ্টিতে পানি বাড়ার পাশাপাশি বজ পাতের ভয়ে মাঠে ধান কাটতে নামতে পারছেন না কৃষকরা। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তারা। এবার রাজনগর উপজেলায় ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এর মধ্যে কাউয়াদীঘি হাওড়ে ৬ হাজার ২৩৭ হেক্টর রয়েছে।
সুনামগঞ্জ ও ছাতক
মধ্যনগরে আরেকটি বাঁধ ভেঙে গেছে। সেই ভাঙন দিয়ে ঢুকে পড়া পানিতে তলিয়ে গেছে জিনারিয়া হাওড়ের বিস্তীর্ণ বোরো খেত। মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেছে অর্ধশতাধিক কৃষকের সারা বছরের স্বপ্ন। বৃহস্পতিবার সকালে বোলাই নদীর পাশের একটি খালের বাঁধ ভেঙে উক্ত হাওড়ের ফসলহানি ঘটে। এর আগে বুধবার উপজেলার এরন বিল হাওড়ে (ইকরাছই হাওড়ে) বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে।
কিশোরগঞ্জ ও পাকুন্দিয়া
জেলার ১৩ উপজেলায় কৃষকের সোনার ফসল ডুবে গেছে। মিঠামইনের ঘাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান বনেদি কৃষক বোরহান উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বুলবুল জানান, এ অঞ্চলের চাষিদের পরিবারগুলো বোরো ফসলকে জীবিকা করে থাকেন। কিন্তু এবার বাম্পার ফলন হলেও ফসল ঘরে তোলার আগেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
বকশীগঞ্জ (জামালপুর)
বকশীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, গারো পাহাড়ের পাদদেশে কামালপুর, বাট্রাজোড় ও বগারচর ইউনিয়নে ৩৫ হেক্টর পাকা ধান খেত পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এছাড়া ৩০ হেক্টর ভুট্টা হেলে পানিতে আক্রান্ত হয়েছে। কৃষি অফিস ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা দিতে তালিকা করা হচ্ছে।
বিভিন্ন স্থানে ঝড়-বৃষ্টিতে ক্ষতি
সাগর উত্তাল থাকায় পায়রা সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত বহাল রেখেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। কালবৈশাখী ঝাড়ের কারণে লক্ষ্মীপুরে মেঘনা নদী উত্তাল হয়ে রয়েছে। দুর্ঘটনা এড়াতে বুধবার লক্ষ্মীপুর-ভোলা নৌ রুটের ফেরি চলাচল বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ।
এছাড়া ছোট লঞ্চ ও ছোট নৌযানও বন্ধ রাখা হয়েছে। চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের রাঙ্গুনিয়া অংশের ৫টি স্থানে গাছের গোড়া উপড়ে ও গাছ ভেঙে পড়ে প্রায় ৪ ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল। পরে ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা গাছ সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করেন।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের শিবরাম রাঙ্গাতিপাড়া গ্রামের খোকন আলী বলেছেন, গাছ ভেঙে টিনের চালের ওপর পড়ে, সবকিছু তছনছ হয়ে গেছে। আমরা গরিব মানুষ-কি দিয়ে টিন কিনে চাল ঠিক করব? ময়মনসিংহের গৌরীপুরে স্কুলভবনসহ অর্ধশত বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে।
মাওহা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবু সালেহ নূর আহম্মদ আকন্দ জানান, বিদ্যালয়ের ৩টি শ্রেণিকক্ষ ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় টানা প্রায় ৩০ ঘণ্টা ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কও কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। খাগড়াছড়ির আম ঝরে পড়ে কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় ২৬টি খুঁটি বিধ্বস্ত ও ৩৫০ স্থানে তার ছিঁড়ে বিদ্যুৎ বিপর্যয় হয়েছে।



