সম্পাদকীয়
লোহার খাঁচা ও লালগালিচা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো ব্যাংক খাত ও আর্থিক নীতি। দেশের অর্থনীতির ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং সামাজিক বৈষম্য দূর করতে এ নীতির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার দ্বিমুখী নীতি শুধু সামাজিক বৈষম্যকেই প্রকট করছে না; বরং দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। দৈনিক আগামীর সময়ে ‘ছোটদের ঋণে কড়াকড়ি, বড়দের ছাড়ের ছড়াছড়ি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা এক নির্মম বৈপরীত্যের ছবি উঠে এসেছে। সাধারণ ও ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের জন্য যেখানে নিয়মকানুনের লোহার খাঁচা তৈরি করা হয়েছে, সেখানে বড় খেলাপিদের জন্য পাতা হয়েছে লালগালিচা।
ধরা যাক, একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা প্রান্তিক কৃষক ব্যাংকের দুয়ারে গেলেন। তিনি হয়তো ৫ বা ১০ লাখ টাকার একটা ঋণের জন্য আবেদন করেছেন। ব্যস! অমনি ব্যাংকের নীতিমালার সতর্ক চশমা এঁটে বসবে চোখে। জমিজমার চৌহদ্দি, চৌদ্দ পুরুষের আমলনামা, গ্যারান্টারের রক্তের গ্রুপ থেকে শুরু করে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ফাইল চালাচালির চক্করে ওই ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতার জুতা ক্ষয় হতে হতে শেষ পর্যন্ত তলাহীন ঝুড়িতে পরিণত হয়। যদি কোনো কারণে এক মাসের কিস্তি দিতে তিনি দেরি করেন, তবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের তৎপরতা দেখার মতো হয়! ব্যাংক থেকে নোটিসের পর নোটিস, প্রতিনিয়ত তাগাদা আর ইজ্জত টানাটানির আয়োজন হয়ে যায় মুহূর্তেই। ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে মামলা করা, কোমরে দড়ি দিয়ে জেলে পাঠানো; কিংবা তাদের শেষসম্বল ভিটামাটি নিলামে তুলতে ব্যাংকগুলো বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না।
অথচ মুদ্রার ওপিঠের দৃশ্যটা রূপকথার মতো। যখন কোনো হাজার কোটি টাকার ‘ভিআইপি’ খেলাপি ব্যাংকের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে পা রাখেন, তখন নিয়মের সব লোহার শিকল যেন কর্পূরের মতো উড়ে যায়। ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বছরের পর বছর যিনি ফেরত দেন না, তার জন্য হাজির হয় ‘বিশেষ ছাড়ের’ বাহারি প্যাকেজ। ডাউন পেমেন্টের নামে নামমাত্র কিছু টাকা জমা দিয়ে বছরের পর বছর ঋণ পুনর্গঠন বা রি-শিডিউলিং করার এক জাদুকরী সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে এই ঋণখেলাপিদের সৌজন্যে। সাধারণ মানুষের করের টাকায় যখন ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি মেটানো হয়, তখন তারা নতুন নতুন বিলাসবহুল গাড়ি হাঁকান, বিদেশে সেকেন্ড হোম কেনেন আর ব্যাংক মালিকদের সঙ্গে এক টেবিলে বসে কফি খান।
এ বৈষম্যমূলক নীতি শুধু ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলাকেই ধ্বংস করছে না; বরং দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে এক মারাত্মক বৈষম্য সৃষ্টি করছে। অর্থনীতিকে যদি সত্যিই সচল রাখতে হয়, তবে এ দ্বিমুখী নীতি বন্ধ করতে হবে। ব্যাংকগুলোকে বুঝতে হবে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) দেশের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতারা কখনো ইচ্ছাকৃত খেলাপি হন না এবং তাদের দেওয়া ঋণের টাকা মার যাওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে কম।
অন্যদিকে, বৃহৎ খেলাপিদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ আদায়ে বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা দূর করে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুত বড় খেলাপিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নজির স্থাপন করতে হবে। আইন সবার জন্য সমান হোক— এই আপ্তবাক্য যেন শুধু কেতাবে না থেকে ব্যাংকের খাতায়ও প্রতিফলিত হয়। নতুবা সাধারণ মানুষের আমানতের টাকায় ‘বড়লোকদের দেউলিয়া হওয়ার উৎসব’ দেখার এ ট্র্যাজিক কমেডি চলতেই থাকবে।



