কঠিন সংকটে বায়বীয় গ্যাস

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জ্বালানি একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এ খাতের অব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিন চলাতে আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে দেশ ও জাতি। জ্বালানি গ্যাস এখন শুধু সংকট নয়, দুর্যোগ ও দুর্ভোগের নাম। এ বিষয়ে গতকাল রবিবারের ‘আগামীর সময়’ প্রধান প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
গ্যাস বিপর্যয় জাতীয় অর্থনীতি, শিল্প, ব্যবসা ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর নেমে আসা এক গভীর সংকটে পরিণত হয়েছে। রাজধানী থেকে জেলা শহর, এমনকি গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত অসংখ্য পরিবার দিনের পর দিন চুলায় আগুন জ্বালাতে পারছে না। ভোররাতে রান্না করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে, আবার কেউ কেউ এলপিজির দিকে ঝুঁকছেন অতিরিক্ত ব্যয় বহন করে। সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত, বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ— সব মিলিয়ে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এখন ভয়াবহভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। এরই মধ্যে গ্রাহকরা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় গ্যাস না পেয়ে রাস্তায় নেমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
বহুদিন ধরেই আমরা দেখছি, গ্রাহকরা নিয়মিত গ্যাসের বিল পরিশোধ করলেও তারা ন্যূনতম সেবাটুকু পাচ্ছেন না। এটি শুধু সেবার ব্যর্থতা নয়, নাগরিক অধিকারেরও লঙ্ঘন। একটি রাষ্ট্রে জনগণ যখন মূল্য পরিশোধ করবে কিন্তু বিনিময়ে সেবা পাবে না, তখন সেই ব্যবস্থার জবাবদিহি কোথায়— এ প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিল আদায়ে কর্তৃপক্ষ যতটা কঠোর, সেবা নিশ্চিত করতে ততটাই উদাসীন। ভোক্তা সেবা না পেয়েও অর্থ পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছে, এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর অন্য কোথাও আছে বলে আমাদের জানা নেই।
গ্যাসের দেশীয় উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও পুরনো ক্ষেত্রগুলোর উন্নয়নে দীর্ঘদিনের অবহেলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। অন্যদিকে আমদানি করা এলএনজির সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এলএনজি সরবরাহ আরও কমে গেলে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হবে, তা অনুমান করাও কঠিন। জ্বালানি নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিকল্পনার এমন ঘাটতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এরই মধ্যে গ্যাস চুরি ও অবৈধ সংযোগের অভিযোগও বাড়ছে। অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহারকারীরা রাষ্ট্রের সম্পদ লুট করছে, অথচ বৈধ গ্রাহকরা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। এটি শুধু আইন প্রয়োগের ব্যর্থতা নয়; বরং দুর্নীতি ও প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশেরও ইঙ্গিত দেয়। গ্যাস চুরি বন্ধে দৃশ্যমান অভিযান, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এবং বিতরণব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার জরুরি।
শিল্প খাতের ওপর এ সংকটের প্রভাব ভয়াবহ। গ্যাসের অভাবে উৎপাদন কমে গেলে রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়ে এবং নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয়। একই সঙ্গে ছোট ব্যবসায়ী, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও পরিবহন খাতও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। অর্থাৎ, গ্যাস সংকট শুধু রান্নাঘরের সমস্যা নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির সংকট।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে অবিলম্বে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, এলএনজি আমদানির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমুখী সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে একটি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা না থাকে। তৃতীয়ত, গ্যাস চুরি ও অবৈধ সংযোগ নির্মূলে কঠোর অভিযান পরিচালনা করতে হবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। চতুর্থত, পাইপলাইন সংস্কার, লিকেজ রোধ এবং স্মার্ট মিটারিংয়ের মাধ্যমে অপচয় কমাতে হবে। পাশাপাশি সংকটের প্রকৃত চিত্র জনসাধারণের সামনে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরে বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করা দরকার। গ্যাস বায়বীয় পদার্থ হলেও এ সংকটকে বায়বীয় ভেবে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।




