সম্পাদকীয়
টেকসই উন্নয়নে বাধা টেকসই দুর্নীতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ২০৩০ সালের মধ্যে অর্জিত হওয়ার কথা। কিন্তু অর্ধেকের বেশি সময় পেরিয়ে বাংলাদেশ আজ এসে দাঁড়িয়েছে এক কঙ্কালসার আত্মপ্রবঞ্চনার মুখোমুখি। ‘আগামীর সময়’-এর বিস্তারিত প্রতিবেদন স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছে— ১৭টি লক্ষ্যমাত্রার ১৩টিতেই বাংলাদেশের ঝুলিতে জমা হয়েছে চূড়ান্ত ব্যর্থতার তিলক। আর ঘুষ, দুর্নীতিসহ অন্তত ৬৭টি অন্তরায়ের জালে আটকা পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে তথাকথিত ‘উন্নয়নের সুবর্ণ গল্প’। খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠান সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) প্রস্তুত করা মূল্যায়নেই এই করুণ দশা উন্মোচিত হয়েছে। অথচ আমাদের অর্থ ও নীতিনির্ধারকদের বাগাড়ম্বর আর রাজনৈতিক তোপ দাগানো যেন থামছেই না।
এসডিজির মূল ভিত্তি যেখানে ন্যায়বিচার, সুশাসন ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠন, সেখানে বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। বিচারব্যবস্থায় পাহাড়সম মামলাজট আর ৭৭ শতাংশ বিচারাধীন বন্দির দীর্ঘশ্বাস দেশের মানবাধিকার ও আইনি কাঠামোর চরম নাজুকতা প্রকাশ করে। অন্যদিকে, দেশের ৪১ শতাংশের বেশি জাতীয় আয় কুক্ষিগত করে রেখেছে মাত্র ১০ শতাংশ ধনাঢ্য পরিবার। ২০১৬ সালের ০.৪৮ গিনি সূচক ২০২৪-এ বেড়ে ০.৫০-এ দাঁড়ানো কেবল কোনো গাণিতিক উপাত্ত নয়; এ হলো দেশে পুঞ্জীভূত তীব্র বৈষম্যের এক ভয়াল দলিল। এর ওপর তিনজন শিক্ষিত যুবকের মধ্যে একজন বেকার, স্বাস্থ্য খাতে সরকারি সহায়তার অভাবে ব্যক্তিগত পকেট থেকে খরচ করতে হয় ৬৮.৫ শতাংশ অর্থ, আর ১২ বিলিয়ন ডলারের জলবায়ু অর্থায়ন চাহিদার বিপরীতে প্রাপ্তি সাকল্যে মাত্র ১১৮ কোটি ৯৫ লাখ ডলার! উপরন্তু ২৫ শতাংশ ব্যবসায়ী লেনদেনে খোলাখুলি ঘুষের ভাগ বসানো প্রশাসনিক ব্যবস্থার নিচে বাস করে উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার চিন্তা দিবাস্বপ্নই বটে! এনআইডি বা জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় সমাজচ্যুত, ছিন্নমূল, তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সরকারি সুবিধাবঞ্চিত থাকা— উন্নয়নের ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ স্লোগানকে কৌতুকে পরিণত করেছে।
তবে চলমান এই সংকট ও নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেছেন, বিএনপির রাজনৈতিক ইশতেহারে উল্লিখিত রূপরেখা অনুসৃত হলে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রার বহু ধাপ সহজেই অতিক্রম করা সম্ভব। নীতিনির্ধারণী জায়গা থেকে এ ধরনের বক্তব্য বাস্তব সংকটগুলো থেকে দৃষ্টি কিছুটা অন্য খাতে প্রবাহিত করে কি না, সে প্রশ্ন অমূলক নয়। যেখানে সাধারণ মানুষ নিত্যদিনের নাগরিক সুবিধা পেতে ভোগান্তির মুখোমুখি হন এবং ব্যাংক খাতের অস্থিতিশীলতা কিংবা খেলাপি ঋণের মতো বড় বৈষম্যগুলো দৃশ্যমান, সেখানে ‘থিয়েটার ডিস্ট্রিক্ট’ বা ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট’-এর মতো ধারণাগুলো বাস্তবায়নের আগে মৌলিক আর্থিক সংস্কার বেশি জরুরি হয়ে পড়ে। শুধু রাজনৈতিক ইশতেহার পেটে নিয়ে ক্ষুধা বা বৈষম্য মেটানো সম্ভব নয়।
উন্নয়ন কোনো ভেলকি নয়। দুর্নীতিকে শুধু মুখে মুখে ‘সমস্যা’ হিসেবে স্বীকার করে আর রাজনৈতিক ঢাকঢোল পিটিয়ে পরিবর্তন আসে না। যতক্ষণ না দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইনের নিরপেক্ষ ও নির্মম প্রয়োগ হচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও আমলাতান্ত্রিক সুবিধাভোগীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত টেকসই উন্নয়ন অধরাই থেকে যাবে। ২০৩০ সালের দরজায় কড়া নাড়ছে সময়। এখন ফাঁকা বুলি আর প্রশাসনিক নাটক বন্ধ করে প্রকৃত সংস্কারে না নামলে বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে টেকসই উন্নয়নের জায়গায় এক স্থায়ী ব্যর্থতার জলজ্যান্ত স্মারক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।






