সম্পাদকীয়
সূচকেই স্বস্তি

একই দিনে চমৎকার দুটি খবর প্রকাশিত হয়েছে আগামীর সময় পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায়— ক্ষুধা সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে ভারত ও পাকিস্তান এবং মজুদের চাল রাখার জায়গা নেই গুদামে। দুটি খবরই আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক। আপাতদৃষ্টিতে, কারণ মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষ জানে, গোলা ভরা ধান থাকলেও তা সবসময় সবার পাতে ওঠে না। আবার পাতের খাবার ক্ষুধা নিবারণ করলেও যে তা যথাযথ পুিষ্টর জোগান দেবে, তার নিশ্চয়তা নেই। শস্য উৎপাদনে মাত্রাতিরিক্ত সার-কীটনাশক ব্যবহারের কারণে ফসলের গুণমান দিন দিন কমে যাচ্ছে।
২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৬ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য রাখেন না। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর ২৫ দশমিক ১ শতাংশ খর্বাকৃতির এবং ১০ দশমিক ৭ শতাংশ ক্ষয়জনিত অপুষ্টিতে ভুগছে। ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত। এই বাস্তবতায় খবর দুটিতে খুব স্বস্তিতে থাকার সুযোগ নেই। কারণ গুদামে চাল থাকতে পারে, কিন্তু দরিদ্র মানুষের হাতে তা কেনার টাকা না থাকলে কিংবা সুষম খাদ্যের সুযোগ না থাকলে ক্ষুধা ও অপুষ্টি থেকেই যায়। খাদ্যপণ্যের মজুদ থাকা আর মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া এক কথা নয়।
সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক বাংলাদেশের একটি তুলনামূলক ভালো অবস্থান তুলে ধরেছে। দক্ষিণ এশিয়ার দুই বড় দেশের তুলনায় বাংলাদেশ ক্ষুধা মোকাবিলায় এগিয়ে আছে। তবে শুধু ‘কত টন চাল উৎপাদন হলো’ দিয়ে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার হিসাব করা যাবে না। খাদ্যের বৈচিত্র্য, পুষ্টিমান, ক্রয়ক্ষমতা ও মানুষের কাছে খাবার পৌঁছানোর সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মজুদ শক্তিশালী হওয়া ভালো খবর। দুর্যোগ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, যুদ্ধ বা আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার সময়ে খাদ্য মজুদ দেশের জন্য বড় নিরাপত্তাবলয়। তবে কথা হলো— এই মজুদের সামাজিক ব্যবহার কতটা কার্যকর? গুদামে চাল পড়ে থাকল, অথচ দরিদ্র পরিবার বাজারে গিয়ে চাল-ডাল-তেল-ডিম কিনতে পারল না— এমন খাদ্যব্যবস্থা পরিসংখ্যান বিচারে শক্তিশালী হলেও মানবিক বিচারে দুর্বল।
বাংলাদেশের খাদ্যসংস্কৃতিতে সিংহভাগ জুড়ে আছে চাল। ভাত আমাদের প্রধান খাদ্য— এ বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু শুধু পেট ভরানো আর পুষ্টি নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। তাই খাদ্য মজুদ নীতিকে ধীরে ধীরে ‘শস্য নিরাপত্তা’ থেকে ‘পুষ্টি নিরাপত্তা’য় নিতে হবে।
এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বড় দুর্বলতা হলো খাদ্য মজুদ, খাদ্য বিতরণ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং পুষ্টি কর্মসূচির মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের ঘাটতি। একদিকে গুদামে বিপুল চাল জমা হচ্ছে, অন্যদিকে দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। আবার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পুষ্টিকর খাবারের প্রাপ্যতাও সমান নয়। ফলে খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকলেও পুষ্টি-ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো সরকারি মজুদ ব্যবস্থাপনা। গুদামে জায়গা না থাকা কোনো গর্বের বিষয় নয়, যদি তার অর্থ দাঁড়ায়— পুরনো মজুদ যথাসময়ে বিতরণ বা বাজার ব্যবস্থাপনায় ব্যবহার করা না যায়। খাদ্যপণ্য দীর্ঘদিন পড়ে থাকলে মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে, সংরক্ষণ ব্যয় বাড়ে এবং নতুন ফসল সংগ্রহেও সমস্যা সৃষ্টি হয়। তাই মজুদকে শুধু পরিমাণ দিয়ে নয়; গুণগতমান, ব্যবহার ও লক্ষ্যভিত্তিক বিতরণ দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে।
গুদামে চাল রাখার জায়গা নেই— এটি যেন বিদ্রূপে পরিণত না হয় যে গুদাম উপচে পড়ছে, অথচ দরিদ্র মানুষের হাঁড়িতে খাবার নেই। খাদ্যপণ্যের মজুদকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, পুষ্টি ও মর্যাদাপূর্ণ খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করাই এখন রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব।



