সম্পাদকীয়
উদাসীন অপচয়

আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কোনো যানবাহন জব্দ করা হলে সেটি আইনি প্রক্রিয়ার অংশ। অপরাধের আলামত হিসেবে গাড়ি জব্দ করা, মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তা সংরক্ষণ করা— এসবের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়ার আড়ালে যদি বছরের পর বছর হাজার হাজার যানবাহন আকাশের নিচে পড়ে থেকে নষ্ট হয়, তাহলে সেটি আর শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা থাকে না; তা পরিণত হয় সম্পদের উদাসীন অপচয়ে।
রাজধানীর বিভিন্ন থানা ও ডাম্পিং স্টেশনে প্রায় ৩৬ হাজার যানবাহন পড়ে রয়েছে। যার মূল্য আনুমানিক শতকোটি টাকা। সারা দেশেও বিক্ষিপ্তভাবে নানা জায়গায় এমন বাস্তবতা রয়েছে। এসব বাহনের পরিসংখ্যান এরই মধ্যে বেড়েছে বৈ কমেনি। এর সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা সহজ নয়। বছরের পর বছর রোদ-বৃষ্টি, ধুলোবালি ও অযত্নে পড়ে থেকে এই যানবাহনের অনেকগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কোথাও মূল্যবান যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে গেছে, কোথাও বা গাড়ির কাঠামোতে লতাগুল্ম, ঘাস-গাছপালা জন্মেছে; আবার কোনো কোনো যানবাহন কার্যত ভাঙাড়িতে পরিণত হয়েছে। এসবের মধ্যে সরকারি গাড়িও রয়েছে। বেসরকারি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন যানবাহন বাদ দিলে সরকারি বাহন যেমন— পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, অন্যান্য বাহিনীসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর বা বিভাগের অকেজো, অব্যবহৃত কিংবা জব্দ করা যানবাহনের মূল্যের সঙ্গে জনসাধারণের করের টাকা জড়িত। সেসব উপেক্ষা বা অবহেলা করা মানে সাধারণ মানুষকে অবমূল্যায়ন করা।
ভাবা যায়, রাষ্ট্রের সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব যাদের হাতে, তাদের চোখের সামনেই হাজার হাজার বাহন ধীরে ধীরে ধ্বংস হচ্ছে! এগুলো কোনো পরিত্যক্ত আবর্জনা নয়। প্রতিটি গাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থনৈতিক মূল্য, আইনি দায় এবং কারও না কারও অধিকার।
উদ্বেগজনক হলো, এই বিপুল সম্পদ সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। বড় আকারের জব্দকৃত যানবাহন রাখার জন্য সরকারিভাবে পর্যাপ্ত ডাম্পিং ইয়ার্ড নেই; মাত্র কিছু থানায় শেডযুক্ত ডাম্পিং সুবিধা রয়েছে। ফলে বহু জায়গায় থানা ভবনের সামনে-পেছনে, চলাচলের জায়গা কিংবা খোলা স্থানে যানবাহন রাখতে হচ্ছে। এভাবে সম্পদ সংরক্ষণ করা যায় না। এটা সম্পদ ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার নামান্তর। দেশের অনেক থানা বা ডাম্পিং স্টেশনে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় গাড়িগুলো আশপাশের রাস্তায় বা ফুটপাতে রাখা হয়। এতে রাস্তা সংকুচিত হয়ে তীব্র যানজট ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন স্তূপ আকারে পড়ে থাকা এই গাড়িগুলোর ভেতর জমে থাকা বৃষ্টির পানি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে, যা ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
এই বিপুলসংখ্যক যানবাহন শুধু মরিচা ধরা লোহালক্কড়ের স্তূপ নয়। এটি আমাদের প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা, ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা এবং রাষ্ট্রীয় ও জনসাধারণের সম্পদের প্রতি উদাসীনতার প্রতিচ্ছবি। আজ যে গাড়ি লাখ টাকা মূল্যের সম্পদ, কাল সেটিই হয়তো কয়েক হাজার টাকার ভাঙাড়ি। সময় যত যাবে, রাষ্ট্রের ক্ষতিও তত বাড়বে।
কয়েকটি ডাম্পিং স্টেশন বানিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন আইনি প্রক্রিয়ার সময়সীমা, দ্রুত নিষ্পত্তি, নিরাপদ সংরক্ষণ এবং কঠোর জবাবদিহির সমন্বিত ব্যবস্থা। যে সম্পদ আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে রাষ্ট্রের হেফাজতে এসেছে, সেটিকে অবহেলায় ধ্বংস হতে দেওয়া যায় না।
জনগণের করের অর্থে গড়ে ওঠা অর্থনীতি এমন অপচয় বহন করার সামর্থ্য রাখে না। রোদ-বৃষ্টিতে পড়ে থাকা প্রতিটি গাড়ি যেন রাষ্ট্রের বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একেকটি প্রশ্ন— আইন রক্ষার নামে জব্দ করা সম্পদই যদি শেষ পর্যন্ত রক্ষা করা না যায়, তাহলে এই অপচয়ের দায় নেবে কে?



