সম্পাদকীয়
এখনো সিন্ডিকেট

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একটি দেশের অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি বোঝা যায় তার সাধারণ মানুষের বাজার করার সক্ষমতা দিয়ে। যখন একজন দিনমজুর, রিকশাচালক, পোশাকশ্রমিক কিংবা নিম্ন আয়ের চাকরিজীবী দিনের শেষে বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় চাল-ডাল, তেল-সবজি কিংবা ডিম কিনতে গিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন, তখন বুঝতে হবে সংকট কেবল বাজারে নয়; রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও সুশাসনের ভিতেও। দেশে নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি সেই দুঃসহ বাস্তবতাই সামনে নিয়ে এসেছে। নিম্ন আয়ের মানুষের নাভিশ্বাস এখন নিত্যদিনের কঠিন সত্য।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)-এর এক গবেষণায় উঠে এসেছে, উৎপাদক থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে একটি পণ্য বহু হাত ঘুরে যায়। প্রতিটি স্তরে যুক্ত হয় অতিরিক্ত মুনাফা, অস্বচ্ছ লেনদেন এবং অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগী। ফলে মাঠের কৃষক যে দামে সবজি বিক্রি করেন, শহরের ভোক্তাকে কয়েক গুণ বেশি মূল্য দিতে হয়। এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কোনো স্বাভাবিক নিয়ম নয়; এটি দুর্বল বিপণনব্যবস্থা, জবাবদিহির অভাব এবং বাজারে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্যের ফল। এ বিষয়ে গতকাল শুক্রবার ‘আগামীর সময়’-এ ‘হাত থেকে হাত ঘুরে বাড়ে পণ্যমূল্য’ ও ‘সবজি কিনতেই শেষ বেতনের অর্ধেক’ শিরোনামে দুটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
এবারের বর্ষায় দেশের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে টানা বৃষ্টিপাত হয়েছে। কিন্তু সেই আবহাওয়াকে অজুহাত বানিয়ে দেশের প্রায় সব অঞ্চলে সবজির দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বাস্তবতা হলো, দেশের সব এলাকায় তো একই সময়ে বন্যা বা দুর্যোগ হয়নি। কোথাও উৎপাদন স্বাভাবিক থেকেছে, কোথাও পর্যাপ্ত সরবরাহও ছিল। তবু সর্বত্র বাজারে মূল্যবৃদ্ধির আঘাত দেখা গেছে। এতে স্পষ্ট হয়, দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রকৃত সংকটের চেয়ে অজুহাতই বেশি কার্যকর। ব্যবসায়ীদের নৈতিকতা এখন প্রশ্নের সম্মুখীন। তাদের ছুতার যেন শেষ নেই—কখনো বৃষ্টি, পরিবহন ব্যয়, জ্বালানির দাম, আবার কখনো সরবরাহ ঘাটতির কথা বলা হয়। কিন্তু সংকট কেটে গেলেও সেই দাম আর আগের অবস্থায় ফিরে আসে না।
এখানেই উঠে আসে বহুল আলোচিত সিন্ডিকেটের প্রসঙ্গ। বাজারে কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী পণ্যের সরবরাহ, মজুদ ও পাইকারি বাণিজ্যের ওপর এমন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে যে, তারা চাইলে রাতারাতি দাম বাড়াতে পারে, আবার প্রয়োজন হলে কৃত্রিম সংকটও সৃষ্টি করতে পারে। সাধারণ ব্যবসায়ীরাও অনেক সময় এই অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারেন না। ভোক্তা তখন হয়ে পড়ে সবচেয়ে দুর্বল পক্ষ। সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব নিয়ে বহু আলোচনা, তদন্ত ও প্রতিশ্রুতি শোনা গেলেও বাস্তবে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা কমই দেখা যায়। ফলে বাজারে একধরনের দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
এখানে বাজার তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর কার্যক্রমও প্রশ্নের মুখে। ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানা করে বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, যদি মূল সমস্যাটি থেকেই যায়। আগে প্রয়োজন সিন্ডিকেট নির্মূল, শক্তিশালী নজরদারি, কঠোর সিদ্ধান্ত এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা। নিত্যপণ্যের বাজার কোনো বিলাসপণ্যের বাজার নয়; মানুষের বেঁচে থাকার প্রশ্ন। বাজার যদি কিছু অসাধু গোষ্ঠীর ইচ্ছার দখলে থাকে, তবে সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ। তাই সাময়িক অভিযান নয়; দরকার স্থায়ী সংস্কার।
ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক সরকারের গায়ে ছিল বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থতার কালিমা, মাঝে অন্তর্বর্তী সরকারও এ বিষয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে। অামাদের প্রবল আশা, বর্তমান সরকারের আমলে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে।






