আগামীর চোখ
পড়ার টেবিলে তথ্য চুরির ফাঁদ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রিয়
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রী
মহাশয়, বড়ই ব্যাকুল হয়ে আজ আপনাকে এই পত্রখানি লিখছি। কাকে লিখব, তা ভাবতেই অর্ধেক চুল পেকে গেল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে লিখব নাকি শিক্ষা বা বাণিজ্যমন্ত্রীকে? চোর ধরবেন কে আর এই ‘তথ্যবাণিজ্য’ ঠেকাবেন কে— তা বুঝতে না পেরে শেষমেশ আপনার শরণাপন্ন হলাম। আপনিই তো আমাদের ডিজিটাল জমানার কাণ্ডারি!
খবরের কাগজ খুললেই বুকটা দুরুদুরু করে। চারদিকে ডেটা চুরির মহোৎসব! আমাদের সাড়ে পাঁচ কোটি নাগরিকের এনআইডি কার্ডের তথ্য টেলিগ্রাম চ্যানেলে বিকানোর খবর এখন বাসি হয়ে গেছে। নাগরিকের নাম, ফোন নাম্বার, ঠিকানা— সব এখন হাটে হাঁড়ি ভাঙার মতো উন্মুক্ত। আলু-পটোল কিনতে গিয়ে সুপারশপে ফোন নাম্বার দিলে, সেই তথ্য চলে যাচ্ছে কোনো বিজ্ঞাপনী সংস্থার হাতে। রাইড শেয়ারিং অ্যাপে চড়লে আমি কখন কোথায় যাচ্ছি, সেই গোপন খবরও আর গোপন থাকছে না।
করপোরেট হাঙরেরা আমাদের বাচ্চাদের ডিজিটাল প্রোফাইল বানিয়ে বাজারে বিক্রি করছে
বড় ধাক্কা খেলাম বাচ্চাদের নিয়ে। ভাবলাম, অনলাইনে পড়াশোনা করে ওরা মানুষ হোক। কিন্তু সেখানেও ওত পেতে আছে বহুজাতিক চোরের দল! ‘টেন মিনিট স্কুল’ নাকি একাই ডজনখানেক ট্র্যাকার বসিয়েছে। বাচ্চাটা গণিতে কাঁচা নাকি ইংরেজিতে দুর্বল, সেই মেধার গোপন খতিয়ান মুহূর্তের মধ্যে চলে যাচ্ছে আমেরিকা, ভারত আর সিঙ্গাপুরের সার্ভারে। ১২ থেকে ১৮ বছরের অবুঝ ছেলেমেয়েগুলো না জেনেই নিজেদের সাইবার ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। পড়ার টেবিলটাই এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে সবচেয়ে বড় ফাঁদ।
বাচ্চারা পড়তে ঢুকলেই নেতিবাচক বিজ্ঞাপনের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। আমরা অভিভাবকরা ভাবছি সন্তান বোধহয় ‘খান একাডেমি’ বা ‘শিখো’ অ্যাপে অঙ্ক কষছে আর ওদিকে ট্র্যাকার মহাশয় তার মগজ পরিমাপ করে আমেরিকার সার্ভারে পাচার করছেন। একেই কি বলে ‘ডিজিটাল লার্নিং’?
মহাশয়, আইনের নাকি বড় অভাব দেশে। ভোক্তা অধিকারে ডিজিটাল তথ্যের নামগন্ধ নেই, উপাত্ত সুরক্ষা আইনও এখনো খসড়ার পাতায় বন্দি। আইনের ফাঁক গলে বহাল তবিয়তে কোটি কোটি টাকার ডেটা ব্যবসা চলছে। আমরা নাগরিকরা এখন ডিজিটাল দুনিয়ায় জামাকাপড়হীন নগ্ন মানুষের মতো দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের হাঁড়ির খবর এখন করপোরেট দুনিয়ার টেবিলে। করপোরেট হাঙরেরা আমাদের বাচ্চাদের ডিজিটাল প্রোফাইল বানিয়ে বাজারে বিক্রি করছে।
বিনীত অনুরোধ, এই তথ্য-চুরির মহোৎসব বন্ধ করতে কঠোর ব্যবস্থা নিন। নয়তো অচিরেই এ দেশের নাগরিকরা শুধু পোশাকেই থাকবে, তাদের সব গোপন তথ্য থাকবে বিদেশি সার্ভারের জিম্মায়।
ইতি
আপনারই এক ‘উন্মুক্ত’ নাগরিক




