দ্বিচারিতায় সৌরবিদ্যুৎ অন্ধকারেই

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর ইচ্ছা সবারই থাকে। প্রতিবেশীদের পেছনে ফেলে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া লড়াকু অর্থনীতির জন্য পরম তৃপ্তির। কিন্তু বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তরের চিত্রটি সে তৃপ্তিতে এক বালতি ঠান্ডা জল ঢেলে দিল। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের জ্বালানি রূপান্তর সূচকে দেখা যাচ্ছে, ১২০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান ৯৯-এ গিয়ে ঠেকেছে। এটা কেবল একটা সংখ্যা নয়, উন্নয়ন আর আধুনিকতার ডঙ্কা বাজানোর মধ্যে এক নির্মম বাস্তবতার চপেটাঘাত। আরও গ্লানির বিষয় হলো, যে শ্রীলঙ্কা কিছুদিন আগেও চরম অর্থনৈতিক সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছিল, তারাও এই সূচকে ৬৮তম স্থান দখল করে বসে আছে। ভারত ৭০ আর পাকিস্তান ৯০ নম্বরে। বাংলাদেশ কেবল নেপালের ওপরে স্থান পেয়ে সন্তুষ্ট। এই গতিকে প্রগতি বললে বোধ হয় শব্দের অপমান হয়।
প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ-সংযোগ বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু পরিচ্ছন্ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের প্রস্তুতিতে ঢাকা এখনো তিমিরেই রয়ে গেছে। আসল রোগটি হলো আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতি অন্ধ মোহ। কয়লা, তেল আর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির পেছনে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার উজাড় হচ্ছে। অথচ ঘরের কাছে যে অফুরন্ত সূর্য আলো দিচ্ছে, তাকে কাজে লাগানোর সদিচ্ছা খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ। মুখে সবুজ রূপান্তরের কথা বলা হলেও কাজে তার উল্টো প্রতিফলন স্পষ্ট। সরকার মুখে যা-ই বলুক, বাস্তবে জীবাশ্ম জ্বালানির পরিকাঠামো বাড়াতেই বেশি আগ্রহী।
বাজেটের হিসাব নিকাশ দেখলে এ বৈপরীত্য আরও প্রকট হয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য বরাদ্দ করা বিপুল টাকার মাত্র ২ শতাংশের কিছু বেশি জুটছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির কপালে। অথচ ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে হলে প্রতি বছর যে পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন, বরাদ্দ তার ধারেকাছেও নেই। নাগরিক সমাজ যে ২৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিলের দাবি তুলেছে, তাকে অলীক কল্পনা বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ। কিন্তু জীবাশ্ম জ্বালানির পেছনে দেশের ভবিষ্যৎ বন্ধক দেওয়া কোন দূরদর্শিতা, তা বোঝা দায়।
মজার বিষয় হলো, অর্থমন্ত্রী বাজেটে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের ওপর আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের এক চমৎকার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষ ভেবেছিল, এবার বুঝি ছাদে ছাদে আলোর জোয়ার আসবে। কিন্তু সে গুড়েই বালি ঢালল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর। বাজেট ঘোষণার ঠিক তিন দিন আগে এক অদ্ভুত শর্তযুক্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে তারা বলে দিল, এই কর-সুবিধা কেবল বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বড় সৌর প্রকল্পই পাবে। দেশের কোটি কোটি সাধারণ গ্রাহক, প্রান্তিক কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এ সুবিধার বাইরেই রয়ে যাবেন। অর্থাৎ, যাদের পয়সা আছে তারা ছাড় পাবেন, আর যারা সামান্য পুঁজি নিয়ে পরিবেশবান্ধব হতে চান তাদের কপালে শুধুই করের বোঝা। এনবিআরের এই নীতি এক হাতে দিয়ে অন্য হাতে কেড়ে নেওয়ার শামিল।
একদিকে পরিবেশ রক্ষার আন্তর্জাতিক মঞ্চে লম্বা-চওড়া প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে দেশের ভেতরে কয়লা আর এলএনজি আমদানিতে কর ছাড়ের মহোৎসব— এই দ্বিচারিতা কতদিন চলবে? আমদানির চোরাবালিতে পা দিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়। সবুজ রূপান্তর কোনো ফ্যাশন নয়, এটি টিকে থাকার লড়াই। নীতিনির্ধারকরা যদি এখনো আমদানির মোহ ত্যাগ করে সর্বজনীন সৌর নীতি গ্রহণ না করেন, তবে সূচকের তলানিতে পড়ে থাকাই নিয়তি হয়ে দাঁড়াবে। মুখের কথায় যে বাতি জ্বলে না, তা বোঝার সময় পার হয়ে যাচ্ছে।




