যে কারণে ফখরুল ইউনূসের চেয়ে ভালো প্রার্থী

নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামই হচ্ছেন বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধান। এই সংবাদের মধ্যে দিয়ে প্রার্থী নিয়ে, বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে বিএনপি-পরবর্তী রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করছে কি না; সে বিষয়ের বিতর্কের অবসান হলো।
নিঃসন্দেহে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যোগ্য প্রার্থী এবং দলের প্রতি ও দেশের রাজনীতিতে তার অবদান সবাই স্বীকার করেন। তাকে প্রার্থী করে এক্ষেত্রে দেশের বৃহত্তর অংশের মানুষের সমর্থন পেয়েছি বিএনপি। তার মধ্যে দুটি গুণ আছে: পরিষ্কার আমেজ এবং রাজনৈতিকভাবে পরিপক্ব।
তবে দলের ভিতরে এবং বাইরে থেকে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে রাষ্ট্রপতি বানানোর একটি চাপ ছিল। এই কথা নেতারা অফ দ্য রেকর্ডে বলে আসছিলেন। সেই কথারই প্রতিধ্বনি ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং দেশের মূলধারার গণমাধ্যমে।
যারা রাষ্ট্রপতি হিসাবে দেখতে চেয়েছিলেন তাদের মতে, অধ্যাপক ইউনূস আন্তর্জাতিক মহলের ব্যাপকভাবে পরিচিত। তার আন্তর্জাতিক পরিচিতি সরকার এবং বাংলাদেশের জন্য লাভ বয়ে আনবে। এই যুক্তি ফেলে দেওয়ার নয়।
কিন্তু এর বিপরীত দিকটিও রয়েছে।
তাকে রাষ্ট্রপতি করা হলে বাংলাদেশের পরিচয় হতো ইউনূসের দেশ। তার অবস্থান হতো বাংলাদেশের ওপরে। তিনি বাংলাদেশকে যতটুকু প্রতিনিধিত্ব করতেন তার চেয়ে বাংলাদেশ তার প্রতিনিধিত্ব করত বেশি। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বাংলাদেশসংক্রান্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয়গুলোয় অধ্যাপক ইউনূসের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটতে পারত। যা দেশের জন্য সবসময় মঙ্গলজনক হতো না সে বিষয়ে নিশ্চিত করে বলা যায়।
কোনো রাষ্ট্রের চেয়ে নেতার আন্তর্জাতিক উচ্চতা বেশি হয়ে গেলে সাধারণ মানুষ এবং একটি দেশের কি ক্ষতি হয় তার একটি জাজ্বল্যমান উদাহরণ দিতে চাই।
২০০৮ সালের ঘটনা। তখন মিয়ানমারে সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে সেখানকার বৌদ্ধ ভিক্ষুরা আন্দোলনে নেমেছে। আমি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মো. গোলাম সারোয়ারের কক্ষে বসে আন্দোলনের সেই দৃশ্য সিএনএন-এ সরাসরি দেখছিলাম। আমি ওনাকে বললাম, ‘এবার বোধ হয় মিয়ানমারের গণতন্ত্রের নেত্রী, নোবেল বিজয়ী অং সান সু চিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হবে সামরিক জান্তা। সেখানে গণতন্ত্র আসবে।’
আমার দিকে খুব শান্তভাবে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘দেখুন গণতন্ত্র-মনা মানুষ হিসাবে আমরা বাংলাদেশিরা সবাই চাই অং সান সু চি মুক্ত হোন। বার্মায় গণতন্ত্র আসুক; কিন্তু মনে রাখবেন, সেখানে গণতন্ত্র এলে বাংলাদেশ চরম বিপদে পড়বে। সু চি কোনোদিন ক্ষমতায় গেলে মিয়ানমার সরকার জোর করে রাখাইনের সব রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়ে দেবে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি বলে আমাদের এখানে পুশইন করবে; আপনি নিশ্চিত থাকুন। আর অং সান সু চির যে আন্তর্জাতিক উচ্চতা তাতে বাংলাদেশ এ ব্যাপারে কিছুই করতে পারবে না। বাংলাদেশের কথা যতই নায্য হোক না কেন কেউ শুনবে না। সু চি যা বলবে তা-ই হবে।’
তার কথা শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। গোলাম সারওয়ার সাহেব বললেন, ‘বিশ্বাস হচ্ছে না! আমার কথা লিখে রাখেন।’
কী অবাক ব্যাপার উনি যা বলেছেন, তা-ই হয়েছে। ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয় সু চির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি। তার সরকারের আমলেই ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর এক সামরিক অভিযান চালিয়ে আরাকান থেকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হলো সাড়ে সাত লাখ মানুষকে। সেই সংখ্যা এখন কমপক্ষে ১৫ লাখ। সত্যিই বাংলাদেশে কিছু করতে পারেনি।
রোহিঙ্গা সংক্কটের সমাধানের জন্য বাংলাদেশের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেখা করেন অং সান সু চির সঙ্গে। তিনি বৈঠকের ব্যাপারে আমাকে বলেছিলেন সু চি তাকে কী বলেছিলেন। বৈঠকে আসাদুজ্জামান খান সু চিকে বলেছেন, ‘আপনারা আপনাদের লোকগুলোকে ফেরত নিন। এত মানুষের চাপ বাংলাদেশে নিতে পারবে না। না নিলে সেখানে চরমপন্থার উত্থান হবে। তখন পরিস্থিতির ওপর আপনাদের এবং আমাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা খুব কঠিন হবে।’
সু চি ওনার কথা শুনে নির্লিপ্তভাবে বলেছিলেন, ‘ওরা (রোহিঙ্গারা) তো এখানে (আরাকানে) থাকতে চায় না। আমরা কীভাবে তাদের গ্রহণ করি! গ্রহণ করলে, পরে আবার (তোমাদের ওখানে) চলে যায়।’
অথচ রোহিঙ্গাদের বিরাট অংশ তাদের নিজ বাসভূমিতে ফিরে যেতে চায়। নোবেল বিজয়ী এই নেত্রীর কী ভয়াবহ মিথ্যাচার!
রোহিঙ্গারা রাখাইনে ফিরে যাক সেটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ, দেশি-বিদেশি এনজিও কেউই চায় না। রোহিঙ্গারা চলে গেলে শরণার্থী সংস্থার কোনো কাজ থাকবে না। এনজিওরা ফান্ড পাবে না। বিভিন্ন দেশের কৌশলগত লাভ কমে যাবে।
যাই হোক, ফিরে আসি মূল কথায়। আমি বলছি না যে অধ্যাপক ইউনূস রাষ্ট্রপতি হলে সু চির মতো কিছু করতেন সেটি বলা সঠিক হবে না; কিন্তু তাকে প্রার্থী করা হলে তিনি আবার বিতর্কিত হতেন। একটি সফল জীবনের শেষপ্রান্তে এসে অধ্যাপক ইউনূস আরেক দফা অসম্মানের মুখে পড়তেন। যা কারও কাম্য হওয়া উচিত নয়।
রাষ্ট্রপতি করা হলে, তার ১৮ মাসের সরকারের সব ভুল সিদ্ধান্তের দায়ভার বিএনপির ঘাড়ে এসে পড়ত। বর্তমান সরকার ইউনূস সরকারের একটি সম্প্রসারণ হিসাবে জনগণের মধ্যে বার্তা যেতে যা বিএনপির জন্য কোনোক্রমেই সুখকর হতো না।
বাংলাদেশের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর পর যদি কোনো মানুষের জন্য দেশের সব শ্রেণির মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকে তিনি হলেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি প্যারিস থেকে আসলেন, মানুষের মন জয় করলেন এবং সরকারের দায়িত্ব নিলেন।
কিন্তু তার সেই জনপ্রিয়তা তিনি ধরে রাখতে পারেননি। বিভিন্ন বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর তাকে সামাজিক গণমাধ্যমসহ সংবাদমাধ্যমে যেভাবে চিত্রণ করা হয়েছে সেটি তার আমেজকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে।
তিনি তার নিজ ক্ষেত্রে ফিরে গেছেন। সেখান থেকেই দেশের জন্য, বিশ্বের জন্য কাজ করুন— সেটিই দেশের মানুষের কাম্য।
লেখক: সাংবাদিক



