রাষ্ট্রের চেয়ে ব্যক্তি যেন বড় না হয়

নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে কে হচ্ছেন নতুন রাষ্ট্রপতি সেটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেসহ মূল ধারার গণমাধ্যমে সংবাদ আসছে। গত সপ্তাহে বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে, নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস হচ্ছেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি। অনেক সংবাদমাধ্যম বলেছে, প্রার্থী করা হলে সংসদে প্রধান বিরোধীদল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তার শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাঁকে সমর্থন দেবে।
এছাড়াও, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামও শোনা যাচ্ছে বেশ জোরেসোরে। তবে দলের পক্ষ থেকে এখনও কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে এব্যাপারে কিছু জানাননি। এজন্য ১২/১৩ আগস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
অনেকেই বলছেন, মুহাম্মদ ইউনূসকে আন্তর্জাতিক মহলের সকলে চেনেন। তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতি সরকার এবং বাংলাদেশকে লাভবান করবে। সেটি একটি ভালো বিবেচনার বিষয়। কিন্তু এর একটি বিপরীত দিকটিও রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি হলে অধ্যাপক ইউনূসের অবস্থান হবে বাংলাদেশের উপরে। তিনি বাংলাদেশকে যতোটুকু প্রতিনিধিত্ব করবেন তার চেয়ে বেশি বাংলাদেশ তাঁর প্রতিনিধিত্ব করবে। বাংলাদেশের পরিচয় হবে ইউনূসের দেশ। যা সবসময় ভালো ফল বয়ে নাও আনতে পারে। বাংলাদেশ সংক্রান্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয়গুলোতে অধ্যাপক ইউনূসের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটতে পারে। যা দেশের জন্য সবসময় মঙ্গলজনক হবে সেবিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না।
কোন রাষ্ট্রের চাইতে নেতার আন্তর্জাতিক উচ্চতা বেশি হয়ে গেলে কি ক্ষতি হয় তার একটি জাজ্বল্যমান উদাহরণ তুলে ধরা যায়।
২০০8 সালের ঘটনা। তখন মিয়ানমারে সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে সেখানকার বৌদ্ধ ভিক্ষুরা আন্দোলনে নেমেছে। আমি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মো. গোলাম সারোয়ারের কক্ষে বসে আন্দোলনের সেই দৃশ্য সিএনএন-এ সরাসরি দেখছিলাম। আমি উনাকে বললাম, এবার বোধ হয় মিয়ানমারের গণতন্ত্রের নেত্রী, নোবেল বিজয়ী অং সান সূ চিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হবে সামরিক জান্তা। সেখানে গণতন্ত্র আসবে।
আমার দিকে খুব শান্তভাবে তাকিয়ে তিনি বললেন, “দেখুন গণতন্ত্র-মনা মানুষ হিসাবে আমরা বাংলাদেশীরা সবাই চাই অং সান সূ চি মুক্ত হোন। বার্মায় গণতন্ত্র আসুক। কিন্তু মনে রাখবেন, সেখানে গণতন্ত্র আসলে বাংলাদেশ চরম বিপদে পড়বে। সূ চি কোনদিন ক্ষমতায় গেলে মিয়ানমার সরকার জোর করে রাখাইনের সকল রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়ে দেবে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি বলে আমাদের এখানে পুশ করবে। আপনি নিশ্চিত থাকুন, আর অং সান সূ চির যে আন্তর্জাতিক উচ্চতা তাতে বাংলাদেশ এব্যাপারে কিছুই করতে পারবে না। বাংলাদেশের কথা যতোই নায্য হোক না কেন কেউ শুনবে না। সূ চি যা বলবে তা-ই হবে।”
তাঁর কথা শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। গোলাম সারওয়ার সাহেব বললেন, “বিশ্বাস হচ্ছে না! আমার কথা লিখে রাখেন।”
কি অবাক ব্যাপার উনি যা বলেছেন, তা-ই হয়েছে। ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয় সূ চির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি। তাঁর সরকারের আমলেই ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর এক সামরিক অভিযান চালিয়ে আরাকান থেকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হলো সাড়ে সাত লাখ মানুষকে। সেই সংখ্যা এখন কমপক্ষে ১৫ লাখ। সত্যিই বাংলাদেশ কিছু করতে পারেনি।
রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধানের জন্য বাংলাদেশের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেখা করেন অং সান সূ চির সাথে। সূ চি তাঁকে কি বলেছিলেন সেটা তিনি পরে আমাকে বলেছিলেন । বৈঠকে আসাদুজ্জামান খান সূ চিকে বলেন, “আপনারা আপনাদের লোকগুলোকে ফেরত নিন। এতো মানুষের চাপ বাংলাদেশে নিতে পারবে না। না নিলে সেখানে চরমপন্থার উত্থান হবে। তখন পরিস্থিতির ওপর আপনাদের এবং আমাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা খুব কঠিন হবে।”
সূ চি উনার কথা শুনে নির্লিপ্তভাবে বলেছিলেন, “ওরা (রোহিঙ্গারা) তো এখানে (আরাকানে) থাকতে চায় না। আমরা কিভাবে তাদের গ্রহন করি! গ্রহন করলে, পরে আবার (তোমাদের ওখানে) চলে যায়।”
অথচ রোহিঙ্গাদের বিরাট অংশ তাঁদের নিজ বাসভূমিতে ফিরে যেতে চায়, এটা সর্বজনবিদিত। নোবেল বিজয়ী এই নেত্রীর কী ভয়াবহ মিথ্যাচার!
রোহিঙ্গারা রাখাইনে ফিরে যাক সেটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ, দেশী-বিদেশি এনজিও কেউই চায় না। রোহিঙ্গারা চলে গেলে শরণার্থী সংস্থার কোন কাজ থাকবে না। এনজিওরা ফান্ড পাবে না। বিভিন্ন দেশের কৌশলগত লাভ কমে যাবে।
যাই হোক, ফিরে আসি মূল কথায়। আমি বলছি না যে অধ্যাপক ইউনূস রাষ্ট্রপতি হলে সূ চির মতো কিছু করবেন। কিন্তু তাঁকে নিয়ে আবার যেভাবে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে তাতে মনে হচ্ছে একটি সফল জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অধ্যাপক ইউনূস আরেক দফা অসম্মানের মুখে পড়তে যাচ্ছেন, যা কারো কাম্য নয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর পর যদি কোন মানুষের জন্য দেশের সকল শ্রেণীর মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকে তিনি হলেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি আসলেন, সরকারের দায়িত্ব নিলেন, কিন্তু তাঁর সেই জনপ্রিয়তা তিনি রাখতে পারেননি। বিভিন্ন বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর তাঁকে সামাজিক গণমাধ্যমসহ সংবাদমাধ্যমে যেভাবে চিত্রণ করা হয়েছে সেটি তাঁর ইমেজকে মারাত্নকভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে।
যাই হোক, তিনি তাঁর নিজ ক্ষেত্রে ফিরে গেছেন। সেখান থেকেই দেশের জন্য, বিশ্বের জন্য কাজ করুন—সেটিই দেশের মানুষের কাম্য। তাঁকে যেন আর টানাটানি না করা হয়।
রাষ্ট্রপতি করা হলে, তাঁর ১৮ মাসের সরকারের সকল ভুল সিদ্ধান্তের দায়ভার বিএনপির ঘাড়ে এসে পড়বে। বর্তমান সরকার ইউনূস সরকারের একটি সম্প্রসারণ -জনগণের মধ্যে এরকম বার্তা যেতে পারে যা বিএনপির জন্য কোনক্রমেই সুখকর হবে না।




