অসম্মানজনক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে জনমনে যে ক্ষোভ, উত্তেজনা ও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে, তা মোটেই অপ্রত্যাশিত নয়। দেশের জনস্বার্থে যেকোনো স্থাপনা সরানো বা ভাঙার প্রয়োজন হতে পারে— এটি অস্বাভাবিক নয়। তবে একজন বীরশ্রেষ্ঠর ভাস্কর্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের ইতিহাস, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মতো জাতীয় আবেগ। সড়ক সম্প্রসারণ, উন্নয়ন প্রকল্প কিংবা নিরাপত্তাজনিত এমন সিদ্ধান্ত অনেক সময় গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু জনগণকে অন্ধকারে রেখে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তড়িঘড়ি করলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে এবং মানুষের আবেগে আঘাত লাগবে।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান শুধু একটি নাম নন; তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের প্রতীক। তার স্মৃতির প্রতি সম্মান জানানো রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। তার ভাস্কর্য সরানোর প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল আগেই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া, অপসারণের কারণ ব্যাখ্যা এবং কোথায় ও কীভাবে নতুনভাবে স্থাপন করা হবে, সে বিষয়ে জনগণকে অবহিত করা। সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল বিশেষ দর্শনীয় বা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত কোনো সুবিধাজনক স্থানে আগে আরেকটি ভাস্কর্য তৈরি করা। এ জাতীয় পদক্ষেপ নিলে বিভ্রান্তি, গুজব ও উত্তেজনা সৃষ্টি হতো না। তা না করে এভাবে ভেঙে ফেলাটা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তিকে উৎসাহিত করবে বলে আমরা মনে করি। এমন সিদ্ধান্ত প্রশাসনে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির অপতৎপরতা কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসে যায়।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্বচ্ছতার অভাবই এ ঘটনার মূল সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন মানুষ দেখেছে কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হচ্ছে, তখন অনেকের কাছেই এটি অসম্মানজনক আচরণ বলে মনে হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের ব্যাখ্যা ও গুজবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভুল বাস্তবায়ন কীভাবে জন-অসন্তোষের জন্ম দিতে পারে, ঝিনাইদহের ঘটনাই তার উদাহরণ। আবার জেলা এবং পৌর প্রশাসন বা সড়ক ও জনপথ বিভাগ এ ঘটনার দায়দায়িত্ব স্বীকার না করায় সংকট আরও গভীর হওয়ার পাশাপাশি ধোঁয়াশাও তৈরি হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় স্মারক, ভাস্কর্য কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপনা কেবল ইট-পাথরের নির্মাণ নয়; এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের আবেগ, ইতিহাস ও জাতীয় পরিচয়। তাই এসব স্পর্শকাতর বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রশাসনের দায়িত্বশীলতা, সংবেদনশীলতা এবং জনসম্পৃক্ততা অপরিহার্য। অন্যদিকে জনগণেরও উচিত কোনো গুজব বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে উত্তেজিত না হয়ে সত্যতা যাচাই করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা। রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব রয়েছে এ ধরনের ঘটনা নিয়ে সংকীর্ণ রাজনৈতিক লাভের চেষ্টা না করে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়ার। জাতীয় বীরদের সম্মান কোনো দল বা মতের বিষয় নয়; এটি সমগ্র জাতির মর্যাদার প্রশ্ন। বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যে আঘাত মানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা।
ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। কোনো জাতীয় স্মৃতিচিহ্ন স্থানান্তর বা সংস্কারের আগে গণমাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ, স্থানীয় জনগণকে অবহিত করা এবং বিকল্প স্থাপনের পরিকল্পনা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা উচিত।
ঝিনাইদহের এ ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির প্রতি সম্মানও কোনোভাবেই উপেক্ষিত হতে পারে না। সিদ্ধান্ত যতই যৌক্তিক হোক, তার বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মানুষের অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা নিশ্চিত করাই হবে দায়িত্বশীলতার পরিচয়।




