সম্পাদকীয়
তৃণমূলের সুরক্ষায়

দেশের প্রত্যন্ত পাড়া-মহল্লা, ইউনিয়নের অলিগলি, পরিবারের ভেতরে কিংবা গ্রামের এমন সব স্থানে, যেখানে সাধারণ পুলিশের নিয়মিত উপস্থিতি সম্ভব হয় না। এই বাস্তবতায় দফাদার ও মহল্লাদারদের পদবি পরিবর্তন করে ‘গ্রাম পুলিশ’ করা এবং তাদের দায়িত্ব ও সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগটি সময়োপযোগী।
আগামীর সময়-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিয়ে, মাদক সেবন ও কারবার এবং অনলাইন জুয়ার মতো সামাজিক ব্যাধি উদ্বেগজনকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব প্রতিরোধে গ্রাম আদালতকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি গ্রাম পুলিশকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে ৪ হাজার ৫৮৮টি ইউনিয়নে প্রায় ৪৫ হাজার ৮৮০ জন গ্রাম পুলিশ দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিটি ইউনিয়নে আরও দুজন করে নারী গ্রাম পুলিশ নিয়োগের প্রস্তাবও রয়েছে। এতে প্রশাসনিক তৃণমূল পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বাড়বে, যা নারী অধিকারের জন্যও ইতিবাচক।
সমগ্র উদ্যোগটি নিছক পদবি পরিবর্তনের বিষয় নয়; বরং তৃণমূলের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর সুযোগ। তাদের দক্ষতা, মর্যাদা ও সক্ষমতা বাড়াতে পারলে অপরাধ ঘটার আগে ও পরে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধের কাজও শক্তিশালী হবে।
বাল্যবিয়ে, মাদক, জুয়া ও অন্যান্য অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু অভিযান দিয়ে জয় করা যাবে না; প্রয়োজন স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি, গ্রাম পুলিশ, নিয়মিত পুলিশ, প্রশাসন, শিক্ষক, অভিভাবক ও সামাজিক সংগঠনের সমন্বিত উদ্যোগ। সেই সমন্বয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হতে পারে গ্রাম পুলিশ।
সাধারণ পুলিশের ওপর দায়িত্বের চাপ অনেক; জনবল ও লজিস্টিক সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সঙ্গে পুলিশের দূরত্ব, অভিযোগ গ্রহণে অনীহা কিংবা স্থানীয় বাস্তবতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণার অভাবও সমস্যা বাড়িয়ে দেয়। ফলে গ্রাম পুলিশের মতো স্থানীয়ভাবে পরিচিত ও উপস্থিত একটি বাহিনীকে পুলিশের ‘প্রথম সারির সহযোগী’ হিসেবে গড়ে তোলা দরকার।
প্রতিবেদনে গ্রাম পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা অপরাধীদের নিয়ে কাজ করলেও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা নেই। তাদের আইনি ক্ষমতা বাড়ানোর দাবিও রয়েছে। অবশ্য গ্রেপ্তারের ক্ষমতা অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। তাই ক্ষমতা দিলেই হবে না; কোন পরিস্থিতিতে, কী প্রক্রিয়ায় এবং কার কাছে জবাবদিহির মাধ্যমে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করা যাবে— তা আইনে স্পষ্ট করতে হবে। যথাযথ প্রশিক্ষণ, লিখিত নির্দেশনা, মানবাধিকারবিষয়ক শিক্ষা এবং পুলিশের তত্ত্বাবধান ছাড়া এমন ক্ষমতা দেওয়া হলে স্থানীয় বিরোধকে অপরাধ হিসেবে দেখানো, ব্যক্তিগত শত্রুতায় ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা নিরীহ মানুষ হয়রানির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। দায়িত্ব পালনকালে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েও তাদের কথা গুরুত্বের দাবি রাখে। বেতন-ভাতা বর্তমান বাজারমূল্যের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ নয়, সেটিও ভাবা দরকার।
একইভাবে গ্রাম আদালতকে সক্রিয় করার উদ্যোগও প্রশংসনীয়। গ্রামের ছোটখাটো বিরোধ ও স্থানীয় সমস্যার দ্রুত, কম খরচে এবং সহজ সমাধানের সুযোগ তৈরি হলে মানুষের থানা ও আদালতমুখী চাপ কমবে। তবে গ্রাম আদালতের বিচারিক ক্ষমতা যতই বাড়ানো হোক, সেটি যেন সংবিধান, প্রচলিত আইন, ন্যায়বিচারের নীতি এবং আপিলের সুযোগের বাইরে না যায়। গুরুতর অপরাধ অবশ্যই যথাযথ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও নিয়মিত বিচারব্যবস্থার আওতায় থাকতে হবে। গ্রাম আদালত হবে দ্রুত ও স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তির একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠান, কোনো বিকল্প ‘আদালত-পুলিশ ব্যবস্থা’ নয়।



