সম্পাদকীয়
বন্দরের ‘বিদেশি’ দাওয়াই ও মরীচিকা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
স্বদেশের লাভজনক ও সুচারুভাবে চলমান সরকারি প্রতিষ্ঠানকে বিদেশি করপোরেটের হাতে সঁপে দেওয়ার এক অদ্ভুত মোহ কাজ করে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের নীতিনির্ধারকদের মনে। আগামীর সময়ের বিশেষ প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। বিগত আওয়ামী জমানার শুরু করা একটি বিতর্কিত প্রক্রিয়াকে বর্তমান বিএনপি সরকার যেভাবে পরম যত্নে ও নীরবে এগিয়ে নিয়ে চলেছে, তা একাধারে পরিহাসপ্রদ ও উদ্বেগজনক। তবে এই নাটকের সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক অধ্যায়টি মঞ্চস্থ হয়েছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। সে সময়েই পিপিপি (পাবলিক-প্রাইভেট-পার্টনারশিপ) কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবটি চূড়ান্ত করে চুক্তি স্বাক্ষরের দিনক্ষণ পর্যন্ত বেঁধে ফেলেছিলেন। শেষমেশ শ্রমিকদের তীব্র আন্দোলনের মুখে সেই চেষ্টা স্থগিত হলেও ক্ষমতার পালাবদলে সরকার বদলালেও সেই চৌধুরী সাহেব কিন্তু স্বমহিমায় বহাল আছেন সপদে এবং বিষয়টি এগিয়ে নিচ্ছেন।
এনসিটির (নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল) মতো সোনার ডিমপাড়া হাঁসকে দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেওয়ার যে তোড়জোড়, তা মূলত এক অবাস্তব মরীচিকার পিছে ছোটা। যে টার্মিনালটি বর্তমানে নিজস্ব দক্ষতায় কনটেইনার ওঠানামার ৪৫ শতাংশ সামলায় এবং রাজস্ব আয়ের ৫৫ শতাংশ দেয়, তাকে আকস্মিক কোন জাদুবলে এক বিদেশি অপারেটর রাতারাতি বিশ্বমানের করে তুলবে, সেই যুক্তি অন্তত অর্থনীতি বা কাণ্ডজ্ঞানের পরিপন্থী। আসল গলদটি বহিরাগত ব্যবস্থাপনায় নয়, গলদটি আমাদের ভেতরের জরাজীর্ণ অবকাঠামোয়। ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের ৪০টি দেশে সফল হতে পারে, কিন্তু চট্টগ্রাম কোনো ‘ট্রান্সশিপমেন্ট’ বন্দর নয়; এটি পণ্যের শেষ গন্তব্য। এখানে জাহাজ থেকে কনটেইনার নামার পর সনাতন পদ্ধতিতে কাস্টমসের কায়িক পরীক্ষা চলতেই থাকে। ফলে কনটেইনার ইয়ার্ডে পড়ে থাকে গড়ে সাড়ে নয় দিন। বিশ্বের কোনো আধুনিক বন্দরে এমন আদিম ব্যবস্থা সচল নেই। শুধু তা-ই নয়, বন্দর থেকে কনটেইনার বের হলেই তা গ্রাস করে মহানগরের তীব্র যানজট। পণ্য পরিবহনের ৯৬ শতাংশই যেখানে সড়কপথের ওপর নির্ভরশীল আর রেল বা নৌপথের অবদান যেখানে সাকল্যে নগণ্য, সেখানে বিদেশি জাদুকর এসে কোন চাবুক ঘুরিয়ে গতি আনবেন? তদুপরি, কর্ণফুলী নদীর নাব্য সংকট, তীব্র বাঁক এবং জোয়ার-ভাটার ওপর জাহাজের বাধ্যতামূলক ছয় ঘণ্টার অপেক্ষা— এসব প্রাকৃতিক ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কি ডিপি ওয়ার্ল্ডের পুঁজিতে নিমেষেই উবে যাবে?
যারা মনে করছেন, বহুজাতিক ডিপি ওয়ার্ল্ড বঙ্গোপসাগরের এই কৌশলগত মোড়ে কেবল ব্যবসাই করতে আসছে, তারা ভূরাজনীতির গভীর খেলাটি এড়িয়ে যাচ্ছেন। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা অমূলক নয় যে, এই দুবাইভিত্তিক সংস্থাটি আসলে ভিন্ন এক বৃহৎ শক্তির পকেট প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতে পারে। ফলে সার্বভৌমত্বও একধরনের ঝুঁকিতে পড়ে। যদি বিদেশি অপারেটরের সত্যিই কাজ দেখানোর সাধ থাকে, তবে তারা নতুন ও শূন্য থেকে শুরু হওয়া ‘বে টার্মিনাল’-এ বিনিয়োগ করুক; রেডিমেড এনসিটির ওপর কেন তাদের শ্যেনদৃষ্টি? দেশের সম্পদকে এভাবে অবারিত করার আগে নীতিনির্ধারকদের ভাবা উচিত। তবে নীরবতাই এখানে একটা কায়দা— যেমনটা লক্ষ করা গেল পিপিপিপ্রধানের নির্বাক ভূমিকায়। ১০ দিনে আটবার কল বা চারবার মেসেজ করলেও তার ল্যান্ডফোন বা মোবাইল টুঁ শব্দ করেনি। দেশের লাভজনক খাতকে পরহস্তগত করার আত্মঘাতী জেদ শেষ পর্যন্ত সুফল নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পঙ্গুত্বই ডেকে আনবে।




