সম্পাদকীয়
সংঘাতে সুফল নেই

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুটি ছাত্রসংগঠন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার খবর মঙ্গল ও গতকাল বুধবার ছিল ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনাগুলো নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এমন একটা সময় এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটল, যখন জুলাই আন্দোলনের দুই বছর পূর্তির বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছিল। উল্লেখ্য, বিবদমান এ দুটি ছাত্রসংগঠনই যুগপৎ অসাধারণ ভূমিকা রেখেছিল চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে। তারা একসঙ্গে জুলাই উদযাপন করার সুযোগ পেয়েছিল গত ৫ আগস্ট। সেটি না করে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ায় দেশে একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিকসহ অন্যান্য মহল ব্যথিত হয়েছে, পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গনেও অস্থিরতার শঙ্কা জেঁকে বসল। সরকারি দল ও বিরোধী দল সমর্থিত ছাত্রসংগঠন পরস্পরের প্রতি যুদ্ধংদেহী মনোভাব অনাকাঙ্ক্ষিত, এতে নানা প্রশ্ন সামনে অাসা স্বাভাবিক।
ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির— উভয় সংগঠনেরই রয়েছে দীর্ঘ ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস। দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাদের সমর্থক ও কর্মী রয়েছে। কিন্তু কোনো সংগঠনের পরিচয়ই সহিংসতার বৈধতা দিতে পারে না। ক্যাম্পাসে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য শক্তি প্রদর্শন, পাল্টাপাল্টি হামলা, ভীতি সৃষ্টি কিংবা প্রতিপক্ষকে দমন করার প্রবণতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভাজন বাড়ায়। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীরাও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে এবং শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি থাকবে, কারণ ছাত্ররাই ভবিষ্যতের নেতৃত্ব তৈরি করে। প্রতিপক্ষের মতকে সম্মান করা, আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে অবস্থান তুলে ধরা এবং শান্তিপূর্ণ সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনাই হওয়া উচিত ছাত্ররাজনীতির মূল বৈশিষ্ট্য।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অতীতে দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির নামে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাজনীতিবিমুখ হয় এবং ছাত্রসংগঠনগুলোর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। বর্তমানের বাংলাদেশে পুরনো সংঘাতের সংস্কৃতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। ২০২৪ সালের আন্দোলনের অন্যতম শিক্ষা ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। সেই শিক্ষা ভুলে গিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে সংঘাতে জড়ানো কোনো পক্ষের জন্যই কল্যাণকর নয়। ওই আন্দোলনে দলীয় দাসত্ব ও লেজুড়বৃত্তি অস্বীকারও ছিল অন্যতম অঙ্গীকার। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর আজ্ঞাবহ হয়ে ছাত্র সংসদ বা হল দখল, নির্যাতন এবং সিট-বাণিজ্যের রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসার স্পষ্ট জন-আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, সে কথা মনে রাখা দরকার।
এ অবস্থায় ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরসহ সব ছাত্র সংগঠনের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রশাসনকেও নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো অপরাধের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় না দেখে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
ছাত্রসংগঠনগুলোর শক্তি প্রমাণের জায়গা হওয়া উচিত ছাত্রসমাজের আস্থা অর্জন, শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা। সংঘর্ষ, দখলদারিত্ব ও ভয়ভীতির রাজনীতি সাময়িকভাবে কারও প্রভাব বাড়াতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা সমাজ ও রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর। এখানে স্মর্তব্য যে, নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ স্বেচ্ছাচারিতা ও সন্ত্রাসের দরুন ছাত্ররাজনীতির গায়ে কালিমা লেপন করেছে। এ পরিণতি থেকেও শিক্ষা নেওয়া দরকার।
ক্যাম্পাস হোক জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, সংঘাতের ময়দান নয়। ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রতি প্রত্যাশা— তারা অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সহনশীল, দায়িত্বশীল ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথ অনুসরণ করবে। কারণ, একটি শিক্ষাঙ্গনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশই পারে একটি উন্নত ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে। বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হচ্ছে মুক্তচিন্তা, জ্ঞানচর্চা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বিকাশের প্রধান ক্ষেত্র। কিন্তু মতের ভিন্নতা যখন সংঘাত, সহিংসতা ও প্রতিহিংসায় রূপ নেয়, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার পরিবেশ এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি।






