সম্পাদকীয়
টানাটানির ফুটপাত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করতে গিয়ে হকারদের হাতে পুলিশ ও সাংবাদিকদের হেনস্তার শিকার হওয়ার ঘটনা দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। ফুটপাত দখলমুক্ত করার মতো একটি জনস্বার্থমূলক অভিযানে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ কিংবা সংবাদ সংগ্রহে নিয়োজিত সাংবাদিকদের বাধা দেওয়া বা হেনস্তা করা কোনো সভ্য মানুষের কাজ নয়। পুলিশ ও সাংবাদিক তাদের পেশাগত কাজের কাছে দায়বদ্ধ। কারও মতপার্থক্য থাকতে পারে, জীবিকার সংকট নিয়ে উদ্বেগও থাকতে পারে; কিন্তু আইন হাতে তুলে নেওয়া বা দায়িত্বশীলদের কাজে বাধা দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
মিরপুর-১০ রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এই এলাকা দিয়ে চলাচল করেন। ফুটপাত যখন দোকানপাট, অস্থায়ী স্থাপনা কিংবা পণ্যসামগ্রীর দখলে চলে যায়, তখন পথচারীকে বাধ্য হয়ে সড়কে নামতে হয়। এতে যানজট যেমন বাড়ে, তেমনি সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে শিশু, নারী, বয়স্ক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষের চলাচলে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হয়। ফলে ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গণস্বার্থসংশ্লিষ্ট।
দখলমুক্ত হওয়ার পর মিরপুর-১০ এলাকায় মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। এটিও গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও হকারদের একগুঁয়েমিতে পথচারীদের চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছিল। ফুটপাত উন্মুক্ত হওয়া নগরবাসীর অধিকার প্রতিষ্ঠারই একটি অংশ। ফুটপাত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্থায়ী ব্যবসার জায়গা নয়; এটি পথচারীর চলাচলের জন্য নির্মিত নাগরিক অবকাঠামো। তাই ওই এলাকার ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
ফুটপাত দখলমুক্ত করাই শেষ কথা নয়। মনে রাখা দরকার, ফুটপাতের ওপর যারা বছরের পর বছর ব্যবসা করেছেন, তাদের বড় একটি অংশ নিম্ন আয়ের মানুষ। তাদের অনেকের পরিবারের একমাত্র বা প্রধান আয়ের উৎস এই ক্ষুদ্র ব্যবসা। এক দিনের অভিযানে তাদের দোকান উচ্ছেদ করে দিলে যদি বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে তারা অর্থনৈতিক সংকটে পড়বেন। ক্ষুধা, বেকারত্ব ও অনিশ্চয়তা থেকে সামাজিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে। ফলে নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় অপরিহার্য। আশঙ্কা হলো, হকারদের আয়রোজগার হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে তাদের কেউ কেউ অপরাধপ্রবণ হয়ে পড়তে পারেন। চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অবশ্য প্রত্যেক হকার অপরাধী নন এবং জীবিকা হারানো মানেই কেউ অপরাধে জড়াবেন— এমন সরলীকরণও ঠিক নয়।
পুনর্বাসন, বিকল্প পেশা বা নতুন ব্যবসা পরিচালনায় অনুমোদনের জন্য হকারদের নিবন্ধন করা যেতে পারে। কারা প্রকৃত হকার, কারা দীর্ঘদিন ধরে সেখানে ব্যবসা করছেন এবং কারা নতুন করে জায়গা দখল করছেন— এসব তথ্য প্রয়োজন। নিবন্ধিত হকারদের জন্য পরিচয়পত্র, নির্দিষ্ট স্থান ও সময় নির্ধারণ নিশ্চিত করা গেলে একদিকে যেমন ফুটপাত দখল রোধ করা সম্ভব, অন্যদিকে প্রকৃত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকাও রক্ষা করা যাবে।
আরেকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ফুটপাত দখলের পেছনে যদি কোনো প্রভাবশালী মহল, চাঁদাবাজি বা অবৈধ অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা থাকে, তাহলে শুধু হকার উচ্ছেদ করে সমস্যার সমাধান হবে না। যারা ফুটপাত দখল করিয়ে অর্থ আদায় করে, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। নইলে আজ একজন হকার উচ্ছেদ হবে, কাল আরেকজন একই জায়গা দখল করবে।
রাজধানীকে বাস ও চলাচলযোগ্য করতে হলে দখলমুক্ত ফুটপাত নিশ্চিত জরুরি। একই সঙ্গে সেই ফুটপাত-সংশ্লিষ্ট অসহায় মানুষের জন্যও চাই মানবিক নগরনীতি।



