অদক্ষতা নাকি অবহেলা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একটি দেশের অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ তার সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা। কৃষকের মাঠের ফসল, শিল্পকারখানার কাঁচামাল, রপ্তানিমুখী পণ্য, শিক্ষার্থী, রোগী কিংবা কর্মজীবী মানুষের প্রতিদিনের চলাচল— সবকিছুর ভিত্তি একটি নিরাপদ ও টেকসই সড়ক নেটওয়ার্ক। অথচ বাংলাদেশে সেই সড়ক-মহাসড়কই আজ অসংখ্য খানাখন্দে ক্ষতবিক্ষত। সরকারি তথ্যেই প্রায় ২৭ হাজার ৩৮০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত। এটি শুধু অবকাঠামোর দুর্বলতার পরিসংখ্যান নয়; এটি রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা, জবাবদিহির অভাব এবং দায়িত্বে অবহেলার এক দলিল।
সড়কের গর্ত দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সড়কের গর্তে পড়ে গণপরিবহন কিংবা ব্যক্তিগত গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রাণ ঝরছে মানুষের। আহত ও পঙ্গু হয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন অনেকে। এ মৃত্যুগুলোকে নিছক দুর্ঘটনা বলে দায় এড়ানো যায় না; এগুলোর বড় অংশই অবহেলাজনিত মৃত্যু। চলতি বছর শুধু জুন মাসেই ৪৭২টি দুর্ঘটনায় ৪৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ২০১৯ সাল থেকে গত জুন পর্যন্ত সাড়ে সাত বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৭ হাজার ৩৬৪ শিক্ষার্থী।
উদ্বেগের বিষয় হলো, বর্ষা এলেই সড়ক ভেঙে যাওয়ার চিত্র যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ সমস্যাটি নতুন নয়, নয় অজানা। তবু বছর ঘুরে একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, মানসম্পন্ন নির্মাণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে ভয়াবহ ঘাটতি রয়েছে। জনগণের করের টাকায় নির্মিত সড়ক যদি কয়েক মাসের মধ্যেই চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে; তবে নির্মাণের মান, তদারকি এবং ঠিকাদারি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
সড়ক-মহাসড়কের বেহাল দশার এক উদোম চিত্র উঠে এসেছে গতকাল রবিবারের ‘আগামীর সময়’-এ। ‘দেশে সড়ক-মহাসড়কে ২৭৩৮০ কিমি ক্ষত’ শিরোনামের সংবাদসহ দুই পৃষ্ঠা জুড়ে ‘পথের কষ্ট’-এর সচিত্র বিশেষ আয়োজনে যে বাস্তবতা উঠে এসেছে, তা হতাশাজনক। সড়কের এমন বাস্তবতায় উন্নয়নের ফাঁপা দৃশ্যই ফুটে ওঠে। দেশের সড়ক-মহাসড়কের সামগ্রিক বাস্তবতার চিত্র এ আয়োজন থেকেই অনুধাবন করা যায়।
এখানে সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়তে হয় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরকে (সওজ)। দেশের মহাসড়ক রক্ষণাবেক্ষণের প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত এ সংস্থার কাছ থেকে জনগণ যে দক্ষতা, দূরদর্শিতা ও জবাবদিহি প্রত্যাশা করে— বাস্তবে তার প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামতে দীর্ঘসূত্রতা, বর্ষার আগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির অভাব, নিম্নমানের সংস্কারকাজ এবং দুর্বল তদারকি বছরের পর বছর একই সমস্যাকে টিকিয়ে রেখেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সংস্কারের কিছুদিন পরই আবার গর্ত সৃষ্টি হচ্ছে। এতে জনমনে প্রশ্ন জাগে— এটি কি শুধু অদক্ষতা, নাকি নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে অনিয়মের ফল?
বাংলাদেশ যখন অবকাঠামো উন্নয়নের নানা সাফল্যের কথা তুলে ধরে, তখন দেশের বহু মহাসড়কের বাস্তব চিত্র সে দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। দৃষ্টিনন্দন প্রকল্প উদ্বোধনের চেয়ে বিদ্যমান সড়ক নিরাপদ রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড নতুন সড়ক নির্মাণ নয়; বরং নির্মিত সড়ক কতদিন টেকসই থাকে এবং মানুষ কতটা নিরাপদে চলাচল করতে পারে, সেটিই বিবেচ্য হওয়া উচিত।
একটি নিরাপদ সড়ক শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়; এটি মানুষের জীবন, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রের অগ্রগতির ভিত্তি। তাই সড়কের প্রতিটি খানাখন্দ যেন আর একটিও প্রাণহানির কারণ না হয়, সে দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। জনগণ কর দেয় নিরাপদ সড়কের জন্য, মৃত্যুফাঁদে চলাচলের জন্য নয়। দায় এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসার তাগিদ দিচ্ছে চলমান বাস্তবতা। অন্যথায় সড়কের প্রতিটি ক্ষত রাষ্ট্রীয় অবহেলার একেকটি নীরব স্মারক হয়ে থেকে যাবে।






