আগামীর চোখ
সিরিয়াল আসার পূর্বে রোগীটি মারা গেল!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বরাবর
সচিব, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের কিডনি বিভাগে ডায়ালাইসিসের সিরিয়ালের অপেক্ষায় আছি। এখন পর্যন্ত টিকে আছি কোনোক্রমে। বিকল হওয়া কিডনি দুটি যে হারে রক্তে বিষ জমাচ্ছে, তাতে খুব বেশি দিন এই নশ্বর পৃথিবীতে শ্বাস নিতে পারব বলে মনে হচ্ছে না। সিরিয়াল পাওয়ার লাইন দীর্ঘ। আগে সিরিয়াল পেতে লাগত দুমাস, এখন অনন্তকালের অপেক্ষা। কারণ, ৩৩টি মেশিনের মধ্যে ১৩টি বিকল। সিরিয়ালের আগে মৃত্যু পরোয়ানা এসে যাওয়ার চান্স বেশি। অফুরন্ত এ সময়টা পত্রিকা পড়ে কাটাই। বুধবার সকালে পত্রিকার পাতা ওল্টাতেই মমেক হাসপাতালের ডায়ালাইসিস মেশিন নিয়ে প্রতিবেদনটি চোখে পড়ল। ভাবলাম, যাওয়ার আগে আপনাকে একটা চিঠি লিখে যাই। এখন চিঠি কবে পৌঁছাবে, তারও নিশ্চয়তা নেই। গায়েবও হয়ে যেতে পারে। বড়ই অনিশ্চিত এক সিস্টেমের মধ্যে আমাদের বসবাস।
৩৩টি মেশিন যদি সচল থাকত, তাহলে দিনে ৯৯ জন মুমূর্ষু মানুষ ডায়ালাইসিস সেবা পেতেন। বাঁচা-মরার কথা জানা নেই, শারীরিক যন্ত্রণা যে লাঘব হতো, তা নিশ্চিত। বিকল হয়ে পড়ে থাকা ১৩টি মেশিনের জন্য প্রতিদিন আমার মতো ৩৯ জন রোগীকে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর প্রহর গুনতে হচ্ছে। বলা ভালো– মৃত্যুর প্রহর গোনার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালে প্রতিবার ডায়ালাইসিসের তিন-চার হাজার টাকার খরচ বহন করার সাধ্য আমাদের মতো মধ্যবিত্ত বা দরিদ্র মানুষের নেই। তাই মাত্র ৮০০ টাকার সরকারি সেবার আশায় এই হাসপাতালের দুয়ারে পড়ে থাকা।
সিরিয়ালের আগে মৃত্যু পরোয়ানা এসে যাওয়ার চান্স বেশি
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, সমস্যা সমাধানে মন্ত্রণালয়ে চিঠি গেছে। আশার বাণী শোনাচ্ছে, নির্মাণাধীন নতুন ভবনে কিডনি বিভাগ পৌঁছে গেলে বর্তমানের তুলনায় আরও আধুনিক ও উন্নত চিকিৎসা সুবিধা থাকবে। সেই চিরাচরিত আমলাতান্ত্রিক সান্ত্বনা। কিন্তু সচিবালয়ে আপনার এসি রুমটিতে যখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চিঠির খামে ধুলোর আস্তরণ জমছে, তখন ডায়ালাইসিসের অভাবে আমার রক্তে বিষের আস্তরণ গাঢ় হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের লাল ফিতার দৌড় শেষ হওয়ার আগেই হয়তো নিঃশ্বাসটা থেমে যাবে। তবে এটুকু নিশ্চিত থাকুন যে কোনো পত্রিকার খবরের শিরোনাম হবে না— ‘সিরিয়াল আসার পূর্বে রোগীটি মারা গেল’।
হাসপাতালের আন্তরিক ডাক্তার কিংবা নার্সদের প্রতি আমার কোনো ক্ষোভ নেই। সকাল, বিকাল ও রাতের তিন শিফটে সীমিত সচল যন্ত্রগুলো নিয়ে তারা নিঃশব্দ সংগ্রাম করছেন। কিন্তু রোগী যদি সিরিয়ালই না পায়, তবে চিকিৎসকদের এই সদিচ্ছা দিয়ে কতক্ষণ রোগীকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব?
ইতি
ডায়ালাইসিসের অপেক্ষায় থাকা এক রোগী






